আবারও হরমুজ বন্ধ করল ইরান

ইসরায়েলের লেবানন হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের চুক্তি লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে আবারও গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড। গতকাল শনিবার ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর জানায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকবে। বিবৃতিতে বলা হয়, এ মর্মে ঘোষণা করা যাচ্ছে যে হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ থাকবে। শত্রুপক্ষের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জবাবে এটি প্রথম পদক্ষেপ। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার স্মারকের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। তবে গতকাল লেবাননে ইসরায়েলের প্রাণঘাতী হামলাকে কেন্দ্র করে নতুন যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক অবকাশযাপন কেন্দ্রে দুই দেশের প্রতিনিধিদের পূর্বনির্ধারিত আলোচনা স্থগিত করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ট্রাম্প প্রশাসনকে সতর্ক করে বলেছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন, যা ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিতে পারে।

ইরানি সামরিক কর্র্তৃপক্ষ আরও জানায়, ‘যদি এই আগ্রাসন অব্যাহত থাকে, তাহলে শত্রুকে তার বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে বাধ্য করতে পরবর্তী পদক্ষেপ পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত এখনো জানা যায়নি। তেহরানের দাবি, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া চুক্তির পরিপন্থী। ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ বলেছে তারা যুদ্ধবিরতি মেনে চলার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও, লেবাননের ভূখণ্ড দখল করার যেকোনো ইসরায়েলি প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। এক বিবৃতিতে গোষ্ঠীটি বলেছে, দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহের কাছাকাছি এক এলাকার দিকে অগ্রসর হওয়া ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হামলা চালিয়েছেন হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা। গত শুক্রবার রাত থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের তীব্র সমালোচনা করেছে হিজবুল্লাহ। গোষ্ঠীটির দাবি তারা যুদ্ধবিরতি কঠোরভাবে মেনে আসছিল, এমনকি ইসরায়েল একেবারে প্রথম মুহূর্ত থেকে এটি লঙ্ঘন করার পরও।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি নিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখা গিয়েছে। গতকাল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, গত শুক্রবারের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল হলেও, সুইজারল্যান্ডে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বে দুই দেশের প্রতিনিধিদল আলোচনায় বসছে। এই আলোচনা চলতি সপ্তাহে হওয়া অন্তর্বর্তী ১৪ দফা চুক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সমঝোতায় রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর লক্ষ্য ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের অবসান ঘটানো। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উইটকফ সুইজারল্যান্ডে গিয়ে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে যোগ দেবেন। কুশনার ইতিমধ্যে সেখানে অবস্থান করছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচিরও শনিবার সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার কথা। তবে পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এ পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানিয়েছে ইরানি কর্র্তৃপক্ষ।

মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর একটি সূত্রের দাবি, আরাগচি গত শুক্রবার কয়েকজন বিদেশিকে বলেছেন, লেবাননে যুদ্ধবিরতি ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার ভবিষ্যৎ অনেকটাই এ যুদ্ধবিরতির ওপর নির্ভর করছে। আরেকটি মধ্যস্থতাকারী সূত্র জানায়, সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার আগে লেবাননে কার্যকরভাবে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে চায় তেহরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি শুক্রবারই সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছেন। গতকাল শনিবার তেহরানে ইরানের আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই বলেন, নাকভির এই সফর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান আলোচনা-সংক্রান্ত প্রচেষ্টার অংশ।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তিচুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে ইসরায়েল। তারা সতর্ক করে বলেছে, দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কিছু পদক্ষেপ এ সম্ভাবনাকে ভেস্তে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, লেবাননে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য দেশের ভেতরে তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে নেতানিয়াহু এই পথে হাঁটতে পারেন। চলতি সপ্তাহে প্রকাশ করা একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনসহ অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে কর্মকর্তারা জানান, ইসরায়েল লেবাননে ইরানের প্রক্সি বা ছায়াগোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে বদ্ধপরিকর। অথচ লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তৈরি হতে যাওয়া চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত। নেতানিয়াহু সরকার এবং ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে যখন উত্তেজনা বাড়ছে, ঠিক তখনই এই গোয়েন্দা বিশ্লেষণ সামনে এলো। ট্রাম্পের চুক্তিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারেএমন কোনো হামলা লেবাননে না চালাতে ইসরায়েলকে প্রকাশ্যে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র।