খালে ‘পুকুরচুরি’র আয়োজন

সোনাগাজীর ডাঙ্গিখাল পুনঃখনন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে পুনঃখননের খরচ পাঁচগুণ বেশি ধরা হয়েছে। চার কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করে আট কিলোমিটারের বরাদ্দ আত্মসাৎ করার পাঁয়তারা চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া খাল খনন শুরুর আগে গঠন করা হয়নি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি। প্রকল্প নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হলেও প্রকল্পের সভাপতি এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের (ইজিপিপি) আওতায় ৫ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার ৯৪৫ টাকা ব্যয়ে ডাঙ্গিখাল পুনঃখনন প্রকল্প নিয়ে রীতিমতো ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালে ডাঙ্গিখালের চার কিলোমিটার খননে ব্যয় হয় ৫৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি খরচ পড়েছে ১৪.২৫ লাখ টাকা। একই খালের অপর অংশের আট কিলোমিটার পুনঃখননে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি খরচ ধরা হয়েছে ৭০.৭৫ লাখ টাকা। মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে দ্বিতীয় প্রকল্পে কিলোমিটারপ্রতি খরচ প্রায় পাঁচগুণ বেশি হচ্ছে।

বর্তমানে খালটির আট কিলোমিটার পুনঃখনন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু বাস্তবে পুরো খালই আট কিলোমিটারের বেশি নয়। আগেই চার কিলোমিটার পুনঃখনন করা হয়েছে। খালের অবশিষ্ট যে অংশ রয়েছে তা চার কিলোমিটারের সামান্য বেশি। বাকি অংশ ছোট ফেনী নদী বলে উপজেলার নকশায় দেখানো হয়েছে। ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ডাঙ্গিখালের দৈর্ঘ্য কোনো অবস্থায়ই আট কিলোমিটার নয়, চার কিলোমিটারের কিছু বেশি হতে পারে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ এপ্রিল প্রকাশিত বরাদ্দপত্রে এই খালের দৈর্ঘ্য দেখানো হয়েছে ২২ কিলোমিটার। ৪ জুন সংশোধিত বরাদ্দপত্রে খালের নাম পরিবর্তন এবং খনন এলাকা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ফলে সংশোধিত প্রকল্পের নাম হয়ে যায় ‘সোনাগাজী ডাঙ্গিখাল (নুর আলমের বাড়ির উত্তর পাশ থেকে ফেনী নদী পর্যন্ত)’। তবে, এতে দৈর্ঘ্য উল্লেখ করা হয়নি। গত ৮ জুন খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনের সময় খালটির খনন অংশের দৈর্ঘ্য সাড়ে ৮ কিলোমিটার উল্লেখ করা হয়।

উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, দেশ ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের জরিপের পর উপজেলা পরিষদ ডাঙ্গিখালের সাহাপুর আশ্রয়ণ প্রকল্প, সোনাগাজী কলেজ এবং হাঁস প্রজনন খামারের পাশ দিয়ে গিয়ে ছোট ফেনী নদী পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার অংশ খননের জন্য প্রস্তাব পাঠায়। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল ২২ কিলোমিটার খননের জন্য প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে গত ৪ জুন সোনাগাজী ডাঙ্গিখাল (নুর আলমের বাড়ির উত্তর পার্শ্ব থেকে ফেনী নদী পর্যন্ত) নামে সংশোধন করা হয়। নির্দেশনা রয়েছে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে খনন কাজ শেষ করতে হবে। তবে এত অল্প সময়ে ‘সাড়ে আট কিলোমিটার’ খাল খননকাজ শেষ করা সম্ভব কি না তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

প্রকল্প অনুসারে, খালের নিচ থেকে ১ মিটার গভীর মাটি উত্তোলন এবং গড়ে আট মিটার প্রস্থ করে খননকাজ সম্পন্ন করার নির্দেশনা রয়েছে। এ বিষয়ে সোনাগাজীর বাসিন্দা সিনিয়র সাংবাদিক জসিম উদ্দিন কাঞ্চন জানান, খালটির যে অংশে বর্তমানে খননকাজ করা হচ্ছে, সেখানে গভীরতা অনুযায়ী এক মিটার পলিমাটি উত্তোলনের কথা থাকলেও বাস্তবে ওই পরিমাণ পলি নেই।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তালিকাভুক্ত শ্রমিক দিয়ে খাল খননের কথা থাকলেও কোনো প্রকার শ্রমিকের উপস্থিতি ছাড়াই এক্সকাভেটর (ভেকু) মেশিন দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। ভেকু মেশিনের চালক জানান, প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা চুক্তিতে তিনি কাজ করছেন। তবে বিলের টাকা কে দিচ্ছে সেটি বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। খাল থেকে এক মিটার গভীর মাটি তোলার বিধান থাকলেও সেই নির্দেশনা মানছে না ভেকুচালক। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না শর্তে বলেন, খালের আট মিটার প্রস্থ খনন করা হচ্ছে না।

উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. এনামুল হক বলেন, খালের প্রস্থ আট মিটার করে খনন করার কথা থাকলেও বিভিন্ন স্থানে দখল ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার কারণে আট মিটার প্রস্থে কাজ করার সুযোগ নেই।

খাল খননের অতিরিক্ত বরাদ্দ নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। ফেসবুকে ‘ইউএনও সোনাগাজী’ নামক পেইজে অনেকেই প্রকল্প নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন। সমিরউদ্দিন নামক একজন সাতটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন করেন প্রকল্প নিয়ে। কয়েস মাহমুদ মন্তব্য করেছেন, ‘হরিলুট চলের দেশে’। খাল খনন এলাকার বাসিন্দারা ক্ষোভ জানালেও হয়রানির ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস করছেন না। লুটপাটের জন্য ভুল তথ্য দিয়ে অতিরিক্ত বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

সোনাগাজী উপজেলা প্রকৌশলী জয় সেন স্বীকার করেন গত ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাসে ডাঙ্গিখালের ভাঙগাবাড়ি থেকে চার কিলোমিটার ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে খনন করা হয়েছে। তবে তিনি বর্তমান খননকাজে অতিরিক্ত বরাদ্দ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

প্রকল্পের সভাপতি কে তা-ও জানেন না স্থানীয়রা। তাকে প্রকল্প এলাকায় কখনো দেখেনি বলে জানান। খাল খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি স্থানীয় সংরক্ষিত ইউপি সদস্য আকলিমা আক্তার এই প্রকল্প ও কমিটির বিষয়ে কিছুই বলতে পারেননি। কতজন সদস্য, সম্পাদক কে, কত টাকা বরাদ্দ তা তিনি জানেন না। কারা কাজ করাচ্ছে, কতজন শ্রমিক কাজ করছে, তাদের মজুরি কীভাবে দেওয়া হচ্ছে, ভেকু চালকের টাকা কারা দিচ্ছেএসব প্রশ্নের উত্তরে তিনি নীরব থাকেন। এসব বিষয় জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ করেন তিনি।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিগ্যান চাকমা বলেন, জরুরি ভিত্তিতে খালের তালিকা চাওয়া হলে ডাঙ্গিখাল ২২ কিলোমিটার থাকায় দ্রুত সময়ে পাঠানো হয়েছিল। পরে দেখা যায় স্বল্প সময়ে পুরো খাল খনন করা সম্ভব নয় এবং সব স্থানে খননের প্রয়োজন নেই। এ কারণে সংশোধন করে সাড়ে আট কিলোমিটার খননকাজ করা হচ্ছে। খালের তথ্য গোপন এবং অস্বাভাবিক বরাদ্দ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খাল খননকাজ শেষ হওয়ার পর হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে প্রকৃত কাজের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। যতটুকু কাজ হবে, ততটুকুর বিল দেওয়া হবে। বাকি টাকা ফেরত চলে যাবে।