ধর্মীয় অনুশীলন বাড়লেও অন্যায় কেন কমছে না

দেশে ধর্মীয় অনুশীলন বেড়েছে। মসজিদে মুসল্লিদের উপস্থিতি অনেক। রমজান এলে ইফতার ও তারাবির আয়োজন হয় বড় পরিসরে। হজ ও ওমরাহ পালনকারীর সংখ্যাও বাড়ছে প্রতি বছর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় আলোচনা এবং বিভিন্ন স্থানে ওয়াজ মাহফিলের জনপ্রিয়তাও বেড়েছে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, সমাজ ক্রমেই ধর্মমুখী হচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে দুর্নীতি, প্রতারণা, মিথ্যাচার, ঘুষ, পারিবারিক সহিংসতা, ব্যবসায়িক অসততা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের খবরও কমছে না।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আনকাবুত ৪৫) এই আয়াত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, নামাজের প্রকৃত প্রভাব মানুষের চরিত্র ও আচরণে প্রতিফলিত হওয়ার কথা। একইভাবে রোজা সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (সুরা বাকারা ১৮৩) অর্থাৎ ইবাদতের লক্ষ্য শুধু আনুষ্ঠানিক পালন নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উৎকর্ষ অর্জন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘আমি উত্তম চরিত্রের পরিপূর্ণতা সাধনের জন্য প্রেরিত হয়েছি।’ (মুসনাদে আহমদ) তাই ইসলামের দৃষ্টিতে নৈতিকতা দ্বীনের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য।

কিন্তু বাস্তবে আমরা প্রায়ই এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা দেখতে পাই। কেউ নিয়মিত নামাজ পড়েন, অথচ ব্যবসায় প্রতারণা করেন। কেউ হজ পালন করেন, কিন্তু কর্মচারীর অধিকার আদায়ে উদাসীন। কেউ কোরআন তেলাওয়াত করেন, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গিবত, অপবাদ ও বিদ্বেষ ছড়ান। এই বৈপরীত্যের কারণ কী?

প্রথমত, ধর্মকে অনেক ক্ষেত্রে আমরা আচারকেন্দ্রিক করে ফেলেছি। ইবাদতের বাহ্যিক রূপের প্রতি যতœশীল হলেও তার উদ্দেশ্য ও শিক্ষার প্রতি সমান গুরুত্ব দিই না। নামাজ পড়ি, কিন্তু নামাজ আমাদের চরিত্রকে কতটা পরিবর্তন করছে, সে প্রশ্ন করি না। রোজা রাখি, কিন্তু আত্মসংযম ও মানবিকতার চর্চা কতটা হচ্ছে, তা বিবেচনা করি না। ফলে ইবাদত জীবনের কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি হওয়ার পরিবর্তে অনেক সময় আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে পরিণত হয়।

দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল। আমরা অনেক সময় ধর্মীয় বিধান জানি, কিন্তু তার নৈতিক দর্শন বুঝি না। সন্তানদের কোরআন পড়ানো হয়, কিন্তু সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও সততার মতো মূল্যবোধের বাস্তব অনুশীলন শেখানোর ক্ষেত্রে ঘাটতি থেকে যায়। ফলে ধর্মীয় জ্ঞান ও বাস্তব জীবনের আচরণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।

তৃতীয়ত, সামাজিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি সমাজে যখন অসততা, দুর্নীতি বা অনিয়ম স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হতে শুরু করে, তখন ব্যক্তি পর্যায়ের ধর্মীয় চর্চাও অনেক সময় সেই সংস্কৃতির প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। মানুষ ব্যক্তিগতভাবে ধর্ম পালন করে, কিন্তু সামাজিক ও পেশাগত জীবনে প্রচলিত অনৈতিকতার সঙ্গে আপস করে নেয়। এর ফলে দ্বৈত মানসিকতার জন্ম হয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, ইবাদতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। নামাজ, রোজা, হজ কিংবা জাকাতের প্রকৃত লক্ষ্য কী, সে বিষয়ে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও গণমাধ্যমে আরও বেশি আলোচনা প্রয়োজন। মানুষকে বুঝতে হবে, ইবাদতের সাফল্য শুধু সম্পাদনের মধ্যে নয়, বরং তার প্রভাব চরিত্র ও আচরণে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তার মধ্যেও নিহিত।

দ্বিতীয়ত, নৈতিকতাকে ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্রীয় অংশে পরিণত করতে হবে। মসজিদের খুতবা, স্কুল-মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম এবং পারিবারিক শিক্ষায় সততা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিকতার বিষয়গুলোকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

তৃতীয়ত, পরিবারকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। শিশুদের সামনে বাবা-মায়ের আচরণই তাদের প্রথম শিক্ষা। একজন শিশু যখন দেখে তার অভিভাবক নামাজও পড়ছেন এবং একই সঙ্গে সততা ও ন্যায়পরায়ণতার চর্চাও করছেন, তখন সে ধর্ম ও নৈতিকতার স্বাভাবিক সম্পর্ক উপলব্ধি করতে শেখে।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামি গবেষক