জ্ঞান সাধনায় ইবনে সিনা

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ১২:১৭ এএম

কোনো কোনো মানুষের অবদান সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী আলো ছড়ায়। তারা কেবল নিজেদের যুগকে প্রভাবিত করেন না, পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তা ও জ্ঞানচর্চার পথও নির্মাণ করে দেন। ইবনে সিনা এমনই এক বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন জ্ঞানের সাধক। গবেষণার পথিকৃৎ। মুসলিম সভ্যতার এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি। চিকিৎসা, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, গণিত ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিস্তৃত অঙ্গনে তার ছাপ আজও স্পষ্ট। মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানচর্চার স্বর্ণযুগের কথা উঠলে যাদের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়, ইবনে সিনা তাদের অন্যতম।

তার পুরো নাম আবু আলী আল-হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সিনা। তিনি ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে বুখারার নিকটবর্তী আফশানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সে সময় মধ্য এশিয়া ছিল জ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। শৈশব থেকেই তিনি অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, অল্প বয়সেই তিনি পবিত্র কোরআন মুখস্থ করেন এবং ভাষা, সাহিত্য, যুক্তিবিদ্যা ও ধর্মীয় জ্ঞানে দক্ষতা অর্জন করেন। কৈশোরে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যয়ন শুরু করেন। খুব দ্রুতই এমন পর্যায়ে পৌঁছান যে সমসাময়িক চিকিৎসকদের কাছেও তিনি বিস্ময়ের কারণ হয়ে ওঠেন।

ইসলাম জ্ঞান অর্জনকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান?’ (সুরা জুমার ৯) অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ইমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উঁচু করবেন।’ (সুরা মুজাদালা ১১) ইবনে সিনার জীবন ছিল এ শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন। তিনি জ্ঞানকে সত্য অনুসন্ধান ও মানবকল্যাণের উপায় হিসেবে দেখেছেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইবনে সিনার অবদান সবচেয়ে বেশি। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-কানুন ফিততিব্ব’ চিকিৎসা ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। এতে রোগের কারণ, লক্ষণ, রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি, ওষুধের ব্যবহার এবং চিকিৎসাবিষয়ক নানা তত্ত্ব সুশৃঙ্খলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গ্রন্থটি এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে, কয়েক শতাব্দী ধরে ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি চিকিৎসাশাস্ত্রের পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। মধ্যযুগীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে আজও গ্রন্থটির নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

তবে ইবনে সিনার গুরুত্ব কেবল একজন চিকিৎসকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চার প্রতীক। তার আরেকটি বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাবুশ শিফা’। এটি মূলত আধ্যাত্মিক ও বৌদ্ধিক অজ্ঞতা দূর করে আত্মার আরোগ্য লাভের উপায় হিসেবে দর্শন ও বিজ্ঞানকে উপস্থাপন করে। এটি দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, গণিত ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানবিষয়ক একটি বৃহৎ জ্ঞানকোষ। এ গ্রন্থে তিনি জ্ঞান, অস্তিত্ব, কারণ ও সৃষ্টিজগতের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার রচনাগুলো মুসলিম বিশ্বে যেমন প্রভাব বিস্তার করেছে, তেমনি পরবর্তী ইউরোপীয় চিন্তাবিদদের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছে।

ইসলামি সভ্যতার একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে ধর্মীয় ও জাগতিক জ্ঞানের মধ্যে অযথা বিভাজন সৃষ্টি করা হয়নি। মুসলিম মনীষীরা কোরআনের নির্দেশনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মহাবিশ^, প্রকৃতি ও মানুষের জীবন নিয়ে গবেষণা করেছেন। কোরআনে বারবার মানুষকে চিন্তা, গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানানো হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানসম্পন্ন লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান ১৯০) ইবনে সিনা এ আহ্বানকে হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন। তার গবেষণা ও অনুসন্ধিৎসা ছিল প্রকৃতির রহস্য উদ্ঘাটনের এক নিরন্তর প্রয়াস।

ইবনে সিনাকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। বিশেষ করে কিছু দার্শনিক প্রশ্নে তার অবস্থান নিয়ে পরবর্তী যুগের আলেমদের মধ্যে আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। কতিপয় বিখ্যাত মুসলিম চিন্তাবিদ তার কিছু দর্শনচিন্তার সমালোচনা করেছেন। পরবর্তীকালে আরও অনেক আলেম তার নির্দিষ্ট কয়েকটি মতের বিরোধিতা করেছেন।

এ কারণে ইসলামি ঐতিহ্যে ইবনে সিনাকে একদিকে যেমন একজন মহান জ্ঞানী ও গবেষক হিসেবে সম্মান করা হয়, অন্যদিকে তার সব দার্শনিক মতামতকে নিরঙ্কুশভাবে গ্রহণ করা হয় না। এটি মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এখানে ব্যক্তিকে নয়, সত্যকে অনুসরণ করা হয়। কোনো মনীষী যত বড়ই হোন না কেন, তার মতামত কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে যাচাই করা হয়।

ইবনে সিনার জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অধ্যবসায়। তিনি অসংখ্য প্রতিকূলতার মধ্যেও গবেষণা চালিয়ে গেছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভ্রমণ, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং নানা সংকটের মধ্যেও তিনি লেখালেখি ও অধ্যয়ন বন্ধ করেননি। ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার কর্মময় জীবন আমাদের শেখায়, জ্ঞান অর্জনের জন্য নিষ্ঠা, ধৈর্য ও কঠোর পরিশ্রমের বিকল্প নেই।

আজকের মুসলিম সমাজের জন্য ইবনে সিনার জীবন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব স্বীকার করা হলেও গবেষণা ও সৃজনশীলতায় অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে আছি। অথচ মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগের মনীষীরা কোরআনের নির্দেশনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অসাধারণ অবদান রেখেছিলেন। ইবনে সিনা তাদের অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিনিধি। তার জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ইমান, জ্ঞান ও গবেষণা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরস্পরের পরিপূরক।

ইবনে সিনা ১০৩৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুন ইরানের হামাদানে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু মৃত্যু তার প্রভাবকে থামাতে পারেনি। তার গ্রন্থ, চিন্তা ও গবেষণা আজও বিশ^জুড়ে অধ্যয়ন করা হয়। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, একজন মুসলমান একই সঙ্গে ধর্মপ্রাণ, জ্ঞানপিপাসু এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত হতে পারেন।

লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত