পৃথিবীর সব অনুভূতিকে শব্দ-বাক্যে রূপ দেওয়া যায় না। কিছু ভালোবাসা শব্দের চেয়ে গভীর। কিছু মমতা প্রকাশের চেয়ে অনুভবে বড়। কিছু মানুষের অবদান ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বাবা তেমনই একজন। তিনি পরিবারের ছায়াদার বৃক্ষ, সন্তানের নির্ভরতার আশ্রয়, জীবনের কঠিন পথে নিরাপত্তার প্রাচীর।
বাবা নিজের চাওয়াকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানের চাওয়াকে পূর্ণ করেন। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর তিনি পরিশ্রম করেন, ক্লান্ত হন, দুশ্চিন্তা করেন, কিন্তু পরিবারের মুখে হাসি দেখলে সব কষ্ট ভুলে যান। অনেক সময় সন্তানরা বাবার এই ত্যাগ বুঝতে পারে না। কারণ বাবারা সাধারণত তাদের ভালোবাসা ভাষায় প্রকাশ করেন না, প্রকাশ করেন দায়িত্বে, শ্রমে, ত্যাগে এবং অবিরাম সংগ্রামে।
ইসলাম এই ভালোবাসার মূল্য গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে। তাই কোরআন-হাদিসে বাবা-মায়ের মর্যাদা অনেক উঁচুতে স্থান পেয়েছে। মহান আল্লাহ তার ইবাদতের নির্দেশ দেওয়ার পরই বাবা-মায়ের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা কেবল তারই ইবাদত করবে এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে উহ শব্দও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা বনি ইসরাইল ২৩)
এই আয়াতের মাধ্যমে বোঝা যায়, ইসলামে বাবা-মায়ের অধিকার কত গুরুত্বপূর্ণ। একজন সন্তানের জীবনে আল্লাহর পর সবচেয়ে বেশি অনুগ্রহ যাদের, তাদের অন্যতম হলেন বাবা।
ইসলামের ইতিহাসে পিতা-পুত্র সম্পর্কের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণগুলোর একটি হলো হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর ঘটনা। আল্লাহর আদেশে যখন ইবরাহিম (আ.) তার প্রিয় পুত্রকে কোরবানি করার কথা জানালেন, তখন ইসমাইল (আ.) বলেছিলেন, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ (সুরা সাফফাত ১০২) এই ঘটনাটি পিতা-পুত্রের গভীর বিশ্বাস, ভালোবাসা ও আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে।
ইসলাম সন্তানের ওপর পিতার বহু অধিকার নির্ধারণ করেছে। তার সম্মান করা, কথা বলার সময় ভদ্রতা বজায় রাখা, কষ্ট না দেওয়া এবং প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট থাকা সন্তানের দায়িত্ব। এ নির্দেশনা সন্তানকে সারা জীবন মানতে হবে। অনেক সময় মানুষ নিজের সন্তানদের জন্য যে মমতা দেখায়, বৃদ্ধ বাবার প্রতি সেই মমতা দেখাতে ভুলে যায়। অথচ ইসলাম এটিকে বড় ধরনের অবহেলা হিসেবে বিবেচনা করেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তার নাক ধূলিমলিন হোক, তার নাক ধূলিমলিন হোক, তার নাক ধূলিমলিন হোক। জিজ্ঞেস করা হলো, কোন ব্যক্তির হে আল্লাহর রাসুল? তিনি বললেন, যে তার পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে বার্ধক্যে পেয়েও জান্নাত অর্জন করতে পারল না।’ (সহিহ মুসলিম) এ হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সেবা করা জান্নাত লাভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
আজকের সমাজে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যায়। মানুষ যত আধুনিক হচ্ছে, পারিবারিক সম্পর্ক তত দুর্বল হচ্ছে। অনেক সন্তান বাবার ত্যাগকে স্বাভাবিক মনে করে। তার পরিশ্রমের মূল্য উপলব্ধি করে না। অথচ একসময় যে মানুষটি সন্তানের জন্য রাত জেগেছেন, নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়েছেন, বৃদ্ধ বয়সে সেই মানুষটিই সন্তানের সামান্য সময় ও মনোযোগের অপেক্ষায় থাকেন।
ইসলাম এই মানসিকতার বিরুদ্ধে শিক্ষা দেয়। একজন মুসলমান কখনো তার বাবাকে বোঝা মনে করতে পারে না। কারণ তিনি জানেন, বাবার ত্যাগের প্রতিদান কখনো পুরোপুরি দেওয়া সম্ভব নয়।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) এক ব্যক্তি সম্পর্কে বলেছিলেন, যে ব্যক্তি নিজের মাকে পিঠে বহন করে পবিত্র কাবা তাওয়াফ করিয়েছিল। সে জানতে চেয়েছিল, এতে কি সে মায়ের হক আদায় করতে পেরেছে? আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেছিলেন, ‘না, এমনকি প্রসবকালের একটি দীর্ঘশ্বাসেরও প্রতিদান হয়নি।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ) মায়ের প্রসঙ্গ এখানে থাকলেও শিক্ষাটি পিতার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। কারণ একজন বাবার ত্যাগ, কষ্ট ও উদ্বেগের প্রকৃত হিসাব কেবল আল্লাহই জানেন।
পিতার মৃত্যুর পরও তার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় না। ইসলাম মৃত পিতার জন্য দোয়া করতে, তার আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে এবং তার অসমাপ্ত দায়িত্বগুলো পূরণ করতে উৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ মারা গেলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি বিষয় ছাড়া। এক. সদকায়ে জারিয়া। দুই. উপকারী জ্ঞান। তিন. নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (সহিহ মুসলিম)
একজন নেক সন্তানের দোয়া মৃত পিতার জন্য অব্যাহত কল্যাণের উৎস হয়ে থাকে। তাই পিতার প্রতি ভালোবাসা কেবল জীবদ্দশার যতেœই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মৃত্যুর পরও তা অব্যাহত রাখতে হবে।
লেখক : ইসলামি গবেষক