মসনদ ছাড়ছেন স্টারমার

বেশ কয়েক মাস ধরে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে যে সংকট ঘনীভূত হচ্ছিল, তা এখন চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণে। তুমুল রাজনৈতিক টানাপড়েনের পর গত শুক্রবার ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার গদি অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে যায়। ওই দিন মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে জিতে স্টারমারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম পার্লামেন্টে ফিরে আসেন, যা তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে লেবার পার্টির নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ জানানোর পথ সুগম করে দিয়েছে। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য অবজারভার জানিয়েছে, স্টারমার আজ সোমবারই পদত্যাগ করতে পারেন এবং ক্ষমতা থেকে বিদায়ের সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঘোষণা করতে পারেন। বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘অবজারভার’। তবে রয়টার্সের কাছে সরকারের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র দাবি করেছে, প্রধানমন্ত্রী স্টারমার এখনো দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালনেই পুরোপুরি মনোনিবেশ করছেন।

দ্য অবজারভারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্টারমার বর্তমানে তার চ্যাকার্স কান্ট্রি হাউসে বা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে স্ত্রীর সঙ্গে এই পুরো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন। লেবার পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতারা ধারণা করছেন, আগামী সোমবারের মধ্যেই তার ভবিষ্যৎ রাজনীতির বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট এবং স্পষ্ট বিবৃতি আসতে পারে। এর আগে গত শুক্রবার যুক্তরাজ্যের এই নেতা জানিয়েছিলেন, তার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোকাবিলা করতে তিনি প্রস্তুত। একই সঙ্গে লেবার পার্টির ভেতরের কোন্দল ও অন্তর্দ্বন্দ্বে দল যাতে নিজেরা নিজেদের ধ্বংস না করে, সেই আহ্বানও জানিয়েছিলেন কিয়ার স্টারমার।

প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ লেবার দলের এক সদস্য জোর দিয়ে বলেছেন যে, স্টারমার কোনো শূন্যতা তৈরি করে ডাউনিং স্ট্রিট থেকে হুট করে পালিয়ে যাবেন না। বরং ‘দায়িত্ববোধ ও মর্যাদার খাতিরে তিনি একটি সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক প্রস্থানের ব্যবস্থা করবেন’। তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়, তিনি বাস্তবতাকে বুঝতে পারছেন। তার ক্ষমতায় থাকার মাধ্যমে চলমান বিশৃঙ্খলা থামানো আর সম্ভব নয়, তাই এখন কেবল একটি পথই খোলা আছে। তিনি এটিকে দেশ ও দলের সেবা করার জন্য একটি দায়িত্বশীল বিকল্প হিসেবেই দেখছেন’। লেবার পার্টির আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী এখন পদত্যাগের বিষয়ে ‘মনস্থির’ করেছেন বলে মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, স্টারমার এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন যে তার পক্ষে আর সমর্থন নেই। তিনি আরও যোগ করেন, সত্যি বলতে সবাই জানে যে এটি আর কোনো টেকসই প্রস্তাব নয়। অবশ্যই এর মধ্যে এক ধরনের দুঃখবোধ কাজ করছে, তবে রাজনীতিতে মাঝে মাঝে কিছু জিনিস অবধারিত হয়ে ওঠে; যেমনটা বরিস জনসন বলেছিলেন, ‘দল যখন একদিকে চলে, তখন সবাই সেদিকেই চলে’। ক্যাবিনেটের এক মন্ত্রী জানান, সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সঙ্গে একের পর এক ব্যক্তিগত আলোচনার পর স্টারমার শান্তভাবে সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছেন। ওই মন্ত্রী বলেন, তিনি দেশের জন্য যা সঠিক তা-ই করতে চান।

মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে ডানপন্থি রিফর্ম ইউকে-কে বিপুল ব্যবধানে হারিয়ে পার্লামেন্টে জায়গা করে নেওয়া বার্নহ্যাম আগামী সোমবার এমপি হিসেবে শপথ নেবেন। চলতি সপ্তাহেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার দেখা করার কথা রয়েছে। বার্নহ্যামের সমর্থকরা দাবি করছেনÑ প্রধানমন্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় সরে না দাঁড়ান, তবে তার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য বার্নহ্যাম ইতিমধ্যে ২০১ জনের বেশি লেবার এমপির সমর্থন নিশ্চিত করেছেন। এই ২০১ সংখ্যাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি পার্লামেন্টারি লেবার পার্টির অর্ধেকেরও বেশি। এর অর্থ হলো স্টারমার আর ব্রিটেনের রাজাকে এটি বলতে পারবেন না যে হাউস অব কমন্সে তার প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠের আস্থা রয়েছে। লেবার পার্টির এক জ্যেষ্ঠ নীতি-নির্ধারক বলেন, ফলের পর অ্যান্ডি যে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছেন, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এমপিদের মনে এখন প্রশ্ন জাগবে কার পক্ষে রিফর্ম সরকারকে থামানো সম্ভব? তিনি মেকারফিল্ডে অত্যন্ত জোরালোভাবে দেখিয়েছেন যে তিনি তা পারেন।

২০২৪ সালের নির্বাচনে মধ্যপন্থি-বাম ঘরানার লেবার পার্টিকে ভূমিধস বিজয় এনে দেন স্টারমার। তবে একের পর এক বিতর্ক ও নীতিগত অবস্থান বদলের কারণে তার জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এতে অনেক ভোটারের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে, জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়নে তিনি সক্ষম নন। গত মাসে স্থানীয় নির্বাচনে দলের বড় পরাজয়ের পর থেকে স্টারমারের দলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আইনপ্রণেতা তার পদত্যাগ দাবি করেছেন। এমনকি প্রতিরক্ষা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতো শীর্ষস্থানীয় সহকর্মীরাও তার নেতৃত্বের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে পদত্যাগ করেছেন।