১৫ সেভের নায়ক

সকালবেলা ঘুম থেকে জেগে উঠে এলোয় রুম যদি নিজেকে চিমটি কেটে নিশ্চিত হতে চান যে, সবকিছু বাস্তব ছিল নাকি কেবলই স্বপ্ন, তবে তাকে কোনোভাবেই দোষ দেওয়া যাবে না।

যে মানুষটি গত বছরের বড় একটা সময় কোনো ক্লাব না পেয়ে নেদারল্যান্ডসের কনকনে ঠাণ্ডায় একা একা অনুশীলন করে কাটিয়েছেন, তিনি আজ বিশ্বমঞ্চে। তা-ই নয়, মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার জনসংখ্যার দেশ কুরাসাওয়ের গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে রুখে দিল লাতিন পরাশক্তি ইকুয়েডরকে। আর সেই ম্যাচের নায়ক? রুম নিজে, যিনি পুরো ম্যাচে অবিশ্বাস্য ১৫টি সেভ করে ২০১৪ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের টিম হাওয়ার্ডের গড়া ঐতিহাসিক রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন।

মেক্সিকোর অ্যারোহেড স্টেডিয়ামের সেই জাদুকরী রাত শেষে কুরাসাওর ড্রেসিংরুমে তখন উৎসবের আমেজ। ডাচ্ রাজা উইলেম আলেকজান্ডার এবং রানি মাক্সিমা সশরীরে হাজির হয়ে নাচছেন ফুটবলারদের সঙ্গে। শুধু তা-ই নয়, কুরাসাওর এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সে আবেগ ধরে রাখতে না পেরে রানি মাক্সিমা স্বয়ং গোলরক্ষক এলোয় রুমকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু একে দেন। নেদারল্যান্ডস রাজ্যের অধীনস্থ একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হওয়ায় কুরাসাওয়ের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে স্টেডিয়ামে হাজির ছিলেন নেদারল্যান্ডসের রাজা উইলেম-আলেকজান্ডার ও রানি মাক্সিমা। ম্যাচ শেষে হাসতে হাসতে রুম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার মনে হয় কিউরাসাওতে এখন আমার একটা ভাষ্কর্যের প্রয়োজন’!

প্রথম ম্যাচে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর কিউরাসাওর জন্য ম্যাচটি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার। ম্যাচের বয়স যখন মাত্র তিন মিনিট, তখনই ইকুয়েডরের অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড এনার ভ্যালেন্সিয়া ১০ গজ দূর থেকে ওয়ান-অন-ওয়ান পজিশনে শট নেন। নিশ্চিত গোলের সেই বল বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে রুখে দেন ৩৭ বছর বয়সী রুম। আর এই প্রথম সেভটিই যেন ম্যাচের ভাগ্য লিখে দেয়।

এরপর শুরু হয় ইকুয়েডরের একের পর এক আক্রমণ আর এলোয় রুমের অতিমানবীয় দেওয়াল হয়ে ওঠার গল্প। ম্যাচের ৪১তম মিনিটে ইকুয়েডরের জন ইবোয়াহর ১৮ মিটার (প্রায় ২০ গজ) দূর থেকে নেওয়া এক বুলেট গতির দূরপাল্লার শট বাতাসে ভেসে যেভাবে রুম প্রতিহত করেন, তা ছিল চোখ ধাঁধানো। এ ছাড়া দ্বিতীয় অর্ধে ভ্যালেন্সিয়ার একটি জোরালো ডাউনওয়ার্ড হেডার অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ডানদিকে ডাইভ দিয়ে সেভ করেন তিনি।

মোট ২৭টি শটের মুখোমুখি হয়ে ইকুয়েডরের ৩.০৫ প্রত্যাশিত গোলকে রুখে দিয়ে ম্যাচটি ০-০ ড্রতে শেষ করেন রুম। ইকুয়েডরের গোলরক্ষক হার্নান গালিন্দেজও ম্যাচ শেষে স্বীকার করতে বাধ্য হন, ‘রুম আজ তার জীবনের সেরা ম্যাচটি খেলেছে।’

টিম হাওয়ার্ডের ১৬টি সেভের রেকর্ডের কথা মনে করিয়ে দিতেই রুম রসিকতা করে বলেন, ‘ম্যাচ চলাকালীন এসব মাথায় থাকে না। তবে রেকর্ডটা ভাঙতে না পারায় একটু খারাপ লাগছে। আমার মনে হয় টিম হাওয়ার্ড টিভির সামনে বসে ঘামছিলেন যে এই বুঝি তার রেকর্ড ভেঙে গেল’!

নেদারল্যান্ডসের জার্মান সীমান্তের কাছে জন্ম নেওয়া ৬ ফুট ৩ ইঞ্চির এই গোলরক্ষকের জন্য অবশ্য এমন অতিমানবীয় পারফরম্যান্স নতুন কিছু নয়। এর আগে ২০১৯ সালের কনকাকাফ গোল্ড কাপে হন্ডুরাসের বিরুদ্ধে দেশের প্রথম ঐতিহাসিক জয়ের ম্যাচেও রুম একাই এক ডজনেরও বেশি সেভ করেছিলেন। তখন এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ছোটবেলায় যখন তিনি বাবার মাতৃভূমি কুরাসাওতে ছুটি কাটাতে যেতেন, তখন থেকেই তার স্বপ্ন ছিল একদিন এই দ্বীপদেশটিকে ফুটবল বিশ্বকাপে নিয়ে যাবেন। ২০১৫ সালে ডাচ্ কিংবদন্তি প্যাট্রিক ক্লুইভার্ট যখন কুরাসাওর কোচের দায়িত্বে ছিলেন, তিনিই রুমকে ফোন করে নেদারল্যান্ডস ছেড়ে এখানে খেলার প্রস্তাব দেন। তখন অনেকেই একে ‘পাগলামি’ বলেছিলেন।

সবচেয়ে কঠিন সময় আসে ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে। বেলজিয়ামের ক্লাব সার্কেল ব্রুগ থেকে বাদ পড়ার পর মাসের পর মাস একা একা ফিটনেস ধরে রাখার লড়াই চালিয়ে গেছেন রুম, শুধু এই বিশ্বকাপের স্বপ্নে। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় স্তরের লিগের ক্লাব ‘মিয়ামি এফসি’-তে যোগ দিলেও মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বমঞ্চ।

বিশ্বকাপ কীভাবে একজন ফুটবলারকে রাতারাতি বৈশ্বিক তারকায় পরিণত করতে পারে, তার প্রমাণ মিলল রুমের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে। ম্যাচের আগে যেখানে তার ফলোয়ার ছিল প্রায় ১ লাখ, মাঝরাতের মধ্যেই তা ছাড়িয়ে যায় ৭ লাখ! কয়েকদিন আগে স্পেনের বিরুদ্ধে কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের গল্প মনে করিয়ে দিয়ে রুম জানান, ভোজিনহার পারফরম্যান্সই তাকে এই ম্যাচে আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।