কে এই উনদাভ

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ১২:৫৫ এএম

জার্মানির ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা বছরের পর বছর ফ্যানদের মনে দাগ কেটে থাকে। ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচটি ছিল ঠিক তেমনই এক মহাকাব্যিক রাত। দীর্ঘ ১২ বছর (২০১৪ বিশ্বকাপের পর) বিশ্বমঞ্চের গ্রুপ পর্ব পার হতে না পারার যে আক্ষেপ পুড়ছিল চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের, তা এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন একজন ‘সুপার সাব’ ডেনিস উনদাভ।

আইভরি কোস্টের বিপক্ষে যখন ১-১ গোলে ম্যাচটি ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই ম্যাচের ৬০ মিনিটে মাঠে নামেন এই ২৯ বছর বয়সী স্ট্রাইকার। এরপর যা হলো, তা রূপকথাকেও হার মানায়। জোড়া গোল করে দলকে ২-১ ব্যবধানের জয় এনে দিয়ে জার্মানিকে তুললেন শেষ ১৬-তে।

কিন্তু কে এই ডেনিস উনদাভ? কীভাবে তিনি বনে গেলেন জার্মানির নতুন ত্রাতা?

উনদাভের জন্ম ১৯৯৬ সালের ১৯ জুলাই জার্মানির ভারেল শহরে। তবে তার শেকড় লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। তার দাদা-দাদি ছিলেন কুর্দিশ-ইয়াজিদি বংশোদ্ভূত, যারা ১৯৮০ সালে তুরস্কের সামরিক অভ্যুত্থানের পর জীবন বাঁচাতে পালিয়ে জার্মানিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পাঁচ ভাইবোনের পরিবারে অভাবের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন উনদাভ। কোনো বিলাসবহুল একাডেমি নয়, কঠোর পরিশ্রম আর ফুটবলকে ভালোবেসেই তার পথ চলা শুরু।

আজ যারা তাকে বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াতে দেখছেন, তারা হয়তো জানেন না যে উনদাভ কোনো ‘আকাশছোঁয়া প্রতিভা’ হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেননি। তার ক্যারিয়ারের গ্রাফটা ছিল ধাপে ধাপে ওপরে ওঠার গল্প :

চতুর্থ বিভাগ দিয়ে শুরু (২০১৪-২০১৫) : জার্মানির আঞ্চলিক লিগের দল টিএসভি হাভেলসে দিয়ে সিনিয়র ক্যারিয়ার শুরু করেন। নিচের স্তরের ক্লাব, ফুটবল থেকে আসা সামান্য পারিশ্রমিকে জীবন চলে না। তাই কারখানায় কাজ নেন উনদাভ, ‘দিনে আট ঘণ্টা লেজার মেশিন চালানোর কাজ করতাম। ঘুম থেকে উঠতাম ভোর ৪টার দিকে, কারখানায় যেতাম, তারপর অনুশীলনে। রাত ৮টার দিকে বাড়িতে ফিরতাম...পরের দিন আবার একইভাবে সব শুরু হতো।’ জার্মানির তৃতীয় বিভাগের ক্লাব মেপেন হয়ে তিনি পাড়ি জমান বেলজিয়ামের ক্লাব রয়্যাল ইউনিয়ন সেন্ট-জিলোয়াসে। সেখানে ৭০ ম্যাচে ৪৫ গোল করে রাতারাতি সবার নজরে আসেন।

২০২২ সালে ইংলিশ ক্লাব ব্রাইটন তাকে ৬ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে দলে নেয়। সেখানে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারদের মতো তারকাদের সঙ্গে ড্রেসিংরুম শেয়ার করলেও প্রিমিয়ার লিগের অধ্যায়টা খুব একটা দীর্ঘ বা সফল হয়নি।

২০২৩ সালের আগস্টে এফবি স্টুটগার্টে ফেরাটাই ছিল উনদাভের ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। গত মৌসুমে স্টুটগার্টকে জার্মানির ঘরোয়া কাপ জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন। আর সদ্যসমাপ্ত বুন্দেসলিগায় তিনি ২৯ ম্যাচে ১৯ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট করে হ্যারি কেইনের ঠিক পেছনে থেকে লিগের অন্যতম শীর্ষ গোলদাতার মর্যাদা পান।

বিশ্বকাপের ঠিক আগেই স্টুটগার্টের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করে উনদাভ বলেছিলেন, ‘আমার জন্য ক্লাবে থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখন আমি সম্পূর্ণ মনোযোগ বিশ্বকাপে দিতে পারব।’

২০২৪ সালের মার্চে ফ্রান্সের বিপক্ষে জার্মানি জাতীয় দলে অভিষেক হওয়া উনদাভ চলতি বিশ্বকাপে এক অনন্য কীর্তি গড়েছেন। এই বিশ্বকাপে তিনি এখনো পর্যন্ত কোনো ম্যাচে শুরুর একাদশে না থেকেও বদলি হিসেবে নেমে ৫টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন (গোল ও অ্যাসিস্ট)। বিশ্বকাপের ইতিহাসে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে এত বড় অবদান এর আগে কেবল ১৯৯০ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের কিংবদন্তি রজার মিলাই রাখতে পেরেছিলেন। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জোড়া গোলের পর তিনি এখন লিওনেল মেসি ও কানাডার জোনাথন ডেভিডের সঙ্গে যৌথভাবে চলতি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ে আছেন।

২০১৪ সালে জার্মানি যখন সর্বশেষ বিশ্বকাপ জেতে, তখন উনদাভের বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। মা-বাবার সঙ্গে টিভিতে খেলা দেখে রাস্তায় গাড়ি নিয়ে উল্লাস করতে বেরিয়ে যেতেন। এবার তিনি নিজেই সেই উল্লাসের মধ্যমণি। উনদাভ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন তার লক্ষ্যের কথা, ‘আমাদের লক্ষ্য বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া। আমি যদি এখন বলি আমরা শুধু শেষ ১৬-তে যেতে চাই, তবে সেটা ভুল হবে। আমাদের প্রত্যেকের একটাই লক্ষ্য।’

একটি চমৎকার কাকতালীয় বিষয় হলো, এই ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে ১৯ জুলাই ঠিক যেদিন ডেনিস উনদাভ তার ৩০তম জন্মদিনে পা দেবেন। জার্মানির সমর্থকরা এখন স্বপ্ন দেখছেন, জন্মদিনের কেক কাটার আগেই উনদাভের হাতে উঠবে সোনালি ট্রফিটি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত