বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে আলোচনা শুরু হচ্ছে

রূপপুরের বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে চলতি সপ্তাহ থেকে আলোচনা শুরু হচ্ছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) মধ্যে এই আলোচনা হবে।

এনপিসিবিএল সূত্র বলছে, গত সপ্তাহে রূপপুরের বিদ্যুতের ট্যারিফ বা দাম নিয়ে আলোচনার জন্য পিডিবিকে কোম্পানির পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। একটি পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট (পিপিএ)-এর খসড়া কপিও পিডিবির কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে সেই পিপিএতে বিদ্যুতের দর কত নির্ধারণ করা হবে, সেই অধ্যায় বা পরিচ্ছেদ বাদ রাখা হয়েছে। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি (ওঅ্যান্ডএম) এবং কেন্দ্রটির জন্য কী পরিমাণ স্পেয়ার পার্টস বা অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ প্রয়োজন হবে, তা এখনো নির্ধারণ করা যায়নি। এজন্য কেন্দ্রটির বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কত পড়বে, তা সুনির্দিষ্ট করা যায়নি।

ওঅ্যান্ডএম চুক্তি করার জন্য রোসাটম সার্ভিসের সঙ্গে এনপিসিবিএলের আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এমনকি কেন্দ্রটির জন্য কী পরিমাণ স্পেয়ার পার্টস প্রয়োজন হবে, তাও চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে।

সাধারণত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আগেই কেন্দ্রটির বিদ্যুতের দাম চূড়ান্ত করে পিডিবির সঙ্গে ক্রয় চুক্তি বা পিপিএ সই হয়। সেখানে রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে যাচ্ছে, অথচ এখনো পিপিএ সই হয়নি। সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির শুনানিতে পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, বারবার জানতে চেয়েও রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষ থেকে উৎপাদন খরচ জানানো হয়নি।

এতে করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু হলে কেন্দ্রের জন্য ভর্তুকি প্রয়োজন হবে না বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাশ্রয় হবে তা নির্ধারণ করতে পারেনি এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. মো. জাহেদুল হাছান এ প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রূপপুর আমাদের প্রথম বিদ্যুৎকেন্দ্র। এজন্য আমাদের অভিজ্ঞতা কম। আমরা একটু বেশি সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছি। একবার ভুল হলে তা সংশোধন করা কঠিন হবে।’

তিনি জানান, রূপপুরের বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের আগে অনেকগুলো চুক্তি করতে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ওঅ্যান্ডএম চুক্তি এবং কী পরিমাণ স্পেয়ার পার্টস প্রয়োজন, তার হিসাব। আমরা এগুলো চূড়ান্ত করেছি। চলতি সপ্তাহ থেকেই ট্যারিফ নিয়ে আলোচনা শুরু করতে পারব বলে মনে করছি,’ বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর আগেই আমরা পিপিএ সই করতে পারব। এখন আমরা ট্যারিফ অংশ বাদ রেখে পিডিবির কাছে একটি পিপিএ পাঠিয়েছি।’

এককভাবে দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের ১.২ গিগাওয়াট ক্ষমতার প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হয়েছে। আগামী দুই মাস পর থেকে রূপপুর থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে ১.২ গিগাওয়াট উৎপাদন করবে ইউনিটটি। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এক বছরের মধ্যে কেন্দ্রটির আরেকটি ১.২ গিগাওয়াট ক্ষমতার ইউনিটও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের সময় প্রতি ডলারের দাম ছিল ৮০ টাকা। কিন্তু গত কয়েক বছরে ডলারের দাম বেড়ে ১২০ টাকায় পৌঁছেছে। তবে রূপপুর প্রকল্পের মূল্য সে অনুযায়ী সমন্বয় করা হয়নি। গত জানুয়ারিতে অন্তর্র্বর্তী সরকার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করে। এতে প্রকল্পের ব্যয় ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকায়।

প্রাথমিকভাবে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির আগে ধারণা করা হয়েছিল, কেন্দ্রটির প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ হবে ৪.৩৮ সেন্ট বা ৫.৪০ টাকা (১২২.৭৫ টাকা বিনিময় হার ধরে)। তবে এখন প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ কিছুটা বাড়তে পারে। আবার রাশিয়ার দেওয়া ঋণ কী প্রক্রিয়ায় পরিশোধ করা হবে, তার ওপরও বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ অনেকাংশে নির্ভর করবে।

দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প রূপপুর ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে। এর নির্মাণ ব্যয়ের ৯০ শতাংশ রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদি ঋণ হিসেবে দিচ্ছে। বাকি অর্থ বাংলাদেশ বিনিয়োগ করছে।

ভিভিইআর-১২০০ মডেলের রুশ প্রযুক্তিটি তৃতীয় প্রজন্মের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তি। এর উৎপাদন দক্ষতা সর্বোচ্চ ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। একবার জ¦ালানি লোড করার পর এটি ১৮ মাস পর্যন্ত চলতে পারে। একটি কেন্দ্র টানা ৫০ বছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম। তবে সংস্কার করে আরও ২৫ বছর পর্যন্ত চালানো সম্ভব। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এরও বেশি সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে বলে রেকর্ড রয়েছে।

রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র অতিরিক্ত ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে বলে সম্প্রতি আলোচনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সারা বিশ্বে রাশিয়ার এই প্রযুক্তির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নির্মাণ ব্যয়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, রূপপুরের ২.৪ গিগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয় ১২.৫৬ বিলিয়ন ডলার। তুরস্কে ৪.৮ গিগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ২৪ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার। সরে একই ক্ষমতার কেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় আরও বেশি, ২৮.৭৫ বিলিয়ন ডলার। হাঙ্গেরিতে ২.৪ গিগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় ১২ বিলিয়ন ডলার এবং কাজাখস্তানে একই ক্ষমতার কেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় ১৬.৫ বিলিয়ন ডলার।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক তুলনায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয়কে অতিরিক্ত বলা যায় কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভিন্নমত পোষণ করছেন। তবে ভারত ও চীন নিজেদের প্রযুক্তিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে, যার ব্যয় রাশিয়ার প্রযুক্তির তুলনায় কিছুটা কম। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি ভোগল পাওয়ার প্ল্যান্টে এপি-১০০০ রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। ২.২৩৪ গিগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার এই কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার।