ইটাপেরি হাঁসের গল্প

দুদিনের দুটি ঘটনা। প্রথমটি ১০ মার্চ ২০১৬-এর এক রোদেলা দুপুরের। শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিল জলাভূমি অভয়াশ্রমে গিয়েছিলাম। বিলে তেমন একটা পাখি নেই। অভয়াশ্রমে ঢুকেই ছয়টি বড় পানকৌড়িকে বিলের পানিতে ভেসে বেড়াতে দেখলাম। ওদের মধ্যে তিনটির পালকে, বিশেষ করে মাথা ও ঘাড়ে প্রজননের রঙের ছোঁয়া লেগেছে। এদের এ দেশত্যাগের সময় হয়ে গেছে। এরপর তিনটি আবাসিক পাখি-বালিহাঁস, হলদে বক ও কালেমের দেখা পেলাম। হাঁটতে হাঁটতে টাওয়ারের নিচে এসে নৌকায় উঠলাম। খানিকটা এগোতেই দুটি রাঙা দিঘেরি হাঁসের দেখা পেলাম। এরপর সাক্ষাৎ হলো কালকুচের বিশাল একঝাঁকের সঙ্গে। কিন্তু নৌকার কাছাকাছি যেতেই ওরা যেন পানির ওপর ১০০ মিটার স্প্রিন্ট প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ল! অন্য পাখিরা এ সময় চলে গেলেও ওরা আছে বেশ সংখ্যায়। তবে শিগগিরই চলে যাবে। ওদের স্প্রিন্ট শেষ হতেই একাকী একটি ছোট আকারের হাঁসকে শাপলা পাতার পাশে খাবার খুঁজতে দেখলাম। হাঁসটিকে আগেও দেখেছি, তবে এত কাছ থেকে নয়। খাওয়ায় ব্যস্ত থাকায় কি না জানি না, ওর মধ্যে চলে যাওয়ার কোনো তাড়া নেই। তাই ওর বেশ কিছু ভালো ছবি তুলতে পারলাম। 

পরের ঘটনা ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। শীতের পরিযায়ী জলচর পাখি দেখার জন্য সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়া হাওরে এসেছি। দুপুরে গোলাবাড়ির ‘হাওর বিলাস’ হোটেল থেকে নৌকায় করে হাওরের রৌয়া বিলের দিকে ছুটলাম। খানিকটা এগোনোর পর একটি মাইজলা বককে মাছের জন্য স্থির দৃষ্টিতে পানিতে তাকিয়ে থাকতে দেখলাম। দুর্লভ বকটির ছবি তোলার সময় ওর প্রায় ১০ মিটার পেছনে তিনটি হাঁস পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছিল। নৌকা কিছুটা কাছাকাছি এগোতেই ওরা উড়াল দিল। আরেকটু এগোনোর পর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আরও ১৫-২০টি একই প্রজাতির হাঁস দেখলাম। রৌয়া বিল থেকে চটাইন্না খাল দিয়ে উত্তর-পশ্চিমের চটাইন্না বিলে গিয়ে একটি কান্দায় (উঁচু জায়গা) নামলাম। কান্দাটি বেশ বড়। এটি পার হয়ে কিছুটা সামনে যেতেই বিলের পানিতে শ’ খানেক চকচকে কাস্তেচরার দেখা মিলল। ওদের ছবি তোলার সময় হঠাৎ পাশ থেকে রৌয়া বিলে দেখা সেই হাঁসের বিশাল একটি ঝাঁক উড়াল দিল। আর দিয়ে গেল ঝকঝকে কতগুলো উড়ন্ত ছবি।

বাইক্কা বিল ও টাঙ্গুয়া হাওরে দেখা এই হাঁসগুলো এ দেশের বহুল দৃশ্যমান পরিযায়ী পাখি ইটাপেরি হাঁস। নাইরলি হাঁস, জিরিয়া হাঁস বা গাঙ রৈব নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম গারগেনি বা ব্লু-উইঙ্গড টিল। অ্যানাটিডি গোত্ররে এই হাঁসের বৈজ্ঞানিক নাম ঝঢ়ধঃঁষধ য়ঁবৎয়ঁবফঁষধ এদের মূল আবাস ইউরোপ ও সাইরেরিয়ার তুন্দ্রা অঞ্চলে।

ইটাপেরি হাঁসের দেহের দৈর্ঘ্য ৩৭-৪১ সেন্টিমিটার। ওজন ৩০০-৪০০ গ্রাম। প্রজননকালে হাঁসা ও হাঁসির পালকের রঙে বেশ পার্থক্য দেখা যায়। হাঁসার গাঢ় বাদামি মাথার চাঁদি হয় কালো। চোখের ওপর থাকে সাদা চওড়া ভ্রু-রেখা। মুখমণ্ডল ও ঘাড়-গলা হয় গাঢ় বাদামি। পিঠ, পেটের নিম্নাংশ ও লেজের তলা বাদামি ও তাতে থাকে কালো কালো বুটি। খয়েরি বুকে গাঢ় দাগ। পেট সাদাটে, পেটের দুপাশে ছোট ছোট রূপালি দাগ। ডানার ওপরটা ধূসর, পেছনের পতাকার অংশে ফ্যাকাশে ডোরা। হাঁসির পালক বাদামি ও তাতে গাঢ় বুটির মতো থাকে। কিন্তু ভ্রু-রেখা অস্পষ্ট। হাঁসা-হাঁসি নির্বিশেষে চোখ ঘন বাদামি ও চঞ্চু কালচে-বাদামি। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল কালচে। প্রজনন মৌসুম ছাড়া অন্য সময় হাঁসা ও হাঁসি দেখতে একই রকম, শুধু ডানার পালকে কিছুটা পার্থক্য থাকে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হাঁসার ডানার পতাকা ও বাদামি দেহতল ছাড়া বাদবাকি অংশ হাঁসির মতোই।

ইটাপেরি হাঁস বহুল দৃশ্যমান পরিযায়ী পাখি। শীতে দেশব্যাপী বিভিন্ন ধরনের জলাশয়ে দেখা যায়। এরা দিবাচর ও সান্ধ্যচারী। সচরাচর মাঝারি থেকে বড় দলে বিচরণ করে। অন্য প্রজাতির পরিযায়ী হাঁসের সঙ্গে মিশ্র ঝাঁকেও দেখা যায়। দ্রুত উড়তে পারে; উড়ার সময় ডানায় হিস্ হিস্ শব্দ হয়। হেঁটে হেঁটে ও পানিতে মাথা ডুবিয়ে খাবার খোঁজে। জলজ উদ্ভিদের বিচি, পাতা ও কাণ্ড প্রিয় খাবার। তবে কদাচিৎ কীটপতঙ্গ ও এদের শুককীট এবং খোলকী প্রাণী, যেমন (চিংড়ি ও কাঁকড়া ইত্যাদি খায়। হাঁসা উচ্চস্বরে ‘ড্রিইইইই ----’ শব্দে চেঁচায় ও হাঁসি ‘ওয়ায়েহ-ওয়ায়েহ ----’ শব্দে ডাকে।

এপ্রিল থেকে মে প্রজননকাল। এ সময় এদের মূল আবাস এলাকার মাটিতে তৃণলতার ওপর বা ঘাসবনে ঘাসের ওপর পালক বিছিয়ে বাসা বানায়। হাঁসি তাতে হালকা পীতাভ রঙের ৮-১২টি ডিম পাড়ে। হাঁসি একাই তা দেয় ও ডিম ফোটে ২১-২৩ দিনে। ছানাদের ওড়ার পালক গজায় ৩৫-৪৯ দিনে। আয়ুষ্কাল ৫-১০ বছর।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ