আলজেরিয়ার বিপক্ষে আমাদের প্রথম ম্যাচের দিন সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের একটা দারুণ মিলনমেলা হয়েছিল কানসাস সিটিতে। আমি সেখানে ফিফার আমন্ত্রণে আসা কিংবদন্তিদের সারিতে বসেছিলাম; আমাদের ’৭৮ আর ’৮৬ বিশ্বকাপের তিন-চারজন পুরনো সতীর্থ আমরা সবাই সেখানে একসঙ্গে ছিলাম।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে আমাদের প্রথম ম্যাচে দলের পারফরম্যান্সে আমি সত্যি খুব সন্তুষ্ট। বিশেষ করে লিওনেল মেসির নেতৃত্ব ছিল দেখার মতো। সে একাই হ্যাটট্রিক করল এবং যখন মাঠ থেকে উঠে যাচ্ছিল, গ্যালারির মানুষ যেভাবে তাকে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে সম্মান জানাল তাতে নতুন করে কিছু বলার থাকে না। আসলে মেসি মানুষকে এই সম্মান জানানোর যথেষ্ট কারণ ও সুযোগ করে দেয়। এমন তো নয় যে সে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৬০ মিনিট খেলে কিছুই করল না! না, সে মাঠে সবকিছুই করেছে। সে বরাবরের মতোই খেলাটাকে মন থেকে উপভোগ করেছে, ঠিক যেভাবে সে বার্সেলোনা, ফ্রান্স কিংবা এখন ইন্টার মিয়ামিতে নিজের খেলাকে উপভোগ করছে।
অনেকে হয়তো জানতে চান এই বয়সে এসে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা কেমন। আমার তো মনে হয়, প্রায় ৩৯ বছর বয়সে পা দিয়েও তার ভেতরের সেই লড়াকু মানসিকতা আর প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব একটুও কমেনি। সে এখন আগের চেয়েও মাঠে আরও নিখুঁতভাবে অবস্থান নিতে পারে। আপনি যখন তাকে একদম সামনে থেকে লাইভ খেলতে দেখবেন, তখন একটা বিষয় খেয়াল করবেন মাঠে সে যে জায়গা বা স্পেসগুলো দখল করে, সেখানে সে সবসময় একাই দাঁড়িয়ে থাকে। ও এতটাই বুদ্ধিমান একজন খেলোয়াড় যে তার মাঠে সারাক্ষণ অনর্থক দৌড়ানোর কোনো প্রয়োজনই পড়ে না; সে স্রেফ হেঁটে হেঁটে পুরো মাঠের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। আর ঠিক নিখুঁত মুহূর্তে সে এমন এক গতির বিস্ফোরণ ঘটায় যা আমরা তার কাছ থেকে সবসময় দেখে অভ্যস্ত, আর তারপর তার গোল করার নিখুঁত দক্ষতা তো সবসময়ই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয়।
মেসির এই খেলার ধরন বা ফুটবলীয় দূরদর্শিতা অবশ্য আমাকে মোটেও অবাক করে না। অবাক না হওয়ার কারণ তার অবিশ্বাস্য ভিশন। সে মাঠের যে পজিশনেই থাকুক না কেন, সবসময় খুঁজে বেড়ায় বলটা ঠিক কোথায় আছে, তার কোন সতীর্থের পায়ে বলটা আছে এবং মাঠের ঠিক কোন জায়গায় অবস্থান নিলে সতীর্থরা তাকে সবচেয়ে সহজে খুঁজে পাবে ও পাস দিতে পারবে।
ম্যাচটার ভেতরের লড়াই নিয়ে যদি বলি বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে প্রথম ম্যাচটা জয় দিয়ে শুরু করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আমি সবসময়ই জোর দিয়ে বলি। যদিও আমি জানি এই কথাটি বলা কিছুটা বাহুল্য বা পুনরুক্তি মনে হতে পারে, কারণ গত কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা প্রথম ম্যাচ হেরেও শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। কিন্তু কাতার বাদে সাধারণত বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচটাই যেকোনো দলের জন্য সবচেয়ে কঠিন আর ভীতিজাগানিয়া হয়। আমার কথা বিশ্বাস না হলে স্পেন বা উরুগুয়ের মতো বড় বড় দলগুলোকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন। এমনকি আমাদের লাতিন আমেরিকার অন্য দল ইকুয়েডর বা প্যারাগুয়ের কথাই ধরুন না কেন। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচটা আপনাকে জিততেই হবে। কীভাবে জিতবেন? যেভাবে পারেন, সেভাবেই! সুন্দর ফুটবল খেলে হোক কিংবা লড়াই করে যেকোনো উপায়ে জয় পাওয়াটাই আসল। কারণ এই প্রথম জয়টা আপনাকে পরের দুটি ম্যাচের জন্য দারুণ একটা সুযোগ এনে দেয়। এটা আপনাকে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত বা শান্ত করে দেবে না ঠিকই, কিন্তু শুরুতেই আপনার পক্ষে ৩টি পয়েন্ট থাকা মানে আপনি মানসিকভাবে অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেলেন।
ম্যাচের শুরুটা আমাদের অসাধারণ ছিল। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনাল আমরা যেভাবে খেলেছিলাম শারীরিক ও মানসিকভাবে শতভাগ প্রস্তুতি আর জেতার তীব্র ক্ষুধা এই ম্যাচেও ঠিক সেই একই আর্জেন্টিনাকে দেখা গেছে। খেলার মাঝে অবশ্য একটা সময় আলজেরিয়া আমাদের জালে বল পাঠিয়ে দিয়েছিল, যা পরে অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। ওই গোল বাতিলের পর আমাদের দলে চার-পাঁচ বা বড় জোর ১০ মিনিটের মতো একটা মৃদু বিভ্রান্তি বা জড়তা কাজ করেছিল। কিন্তু ওইটুকু সময় বাদ দিলে, পুরো ম্যাচটা ছিল আমাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। ওই বিভ্রান্তির ধাক্কা সামলে ওঠার পর বলতে গেলে পুরোটা সময়জুড়েই মাঠে আর্জেন্টিনার একক আধিপত্য ছিল।
তবে এই ম্যাচের পর সাংবাদিকরা আমাকে একটি ঐতিহাসিক তুলনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। তারা বলছেন, ১৯৭৮ সালের কেম্পেস কি ১৯৮৬ সালের ম্যারাডোনা কিংবা ২০২২ সালের মেসির স্তরের কাছাকাছি দাঁড়াতে পারে?
আমি সরাসরি তাদের এই তুলনাকে নাকচ করে দিয়েছি। কারণ আমার মনে হয়, আমাদের মধ্যে সরাসরি তুলনা সম্ভবই নয়। ডিয়েগো আর লিওনেল এই দুজন হলো ফুটবলের দুই অবিসংবাদিত অতিমানব। মাঠের ভেতর ওদের পাশে খেলাটাই ছিল এক কঠিন ব্যাপার, কারণ ওরা নিজেদের অতিমানবীয় খেলার কারণে মাঝেমধ্যে মাঠের বাকিদের রীতিমতো লজ্জায় ফেলে দিত! ওরা এতটাই বুদ্ধিমান যে, বল পায়ে আসার পর কী করতে হবে তা নিয়ে মাঠে বসে তাৎক্ষণিকভাবে ভাবে না, বরং বল পাওয়ার ১০ মিনিট আগেই ওদের মাথায় পুরো ছকটা তৈরি হয়ে থাকে।
আপনারা তো জানেন না, সাধারণ একজন খেলোয়াড়ের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় যে পরের মুহূর্তে কী হতে যাচ্ছে। ডিয়েগোর সঙ্গে তো আমার নিজের খেলার সুযোগ হয়েছিল (মেসির সঙ্গে না হলেও)। ও যখন বল পায়ে নিয়ে মাঠের ভেতর দৌড়াত এবং কোনো সতীর্থকে পাস দেওয়ার ভান করত, আমরা বোকার মতো এক দিকে দৌড় দিতাম। অথচ ও নিখুঁত এক কাট-ইন বা ড্রিবলিং করে অন্য দিক দিয়ে ভেতরে ঢুকে যেত আর আমাদের ওই দৌড়টাই বৃথা যেত! আবার মাঝে মাঝে ও যখন মাঠের মাঝখান থেকে মাথা তুলে দেখত আমরা স্থির দাঁড়িয়ে আছি, তখন ও আমাদের পায়ে পাস দিয়ে দিত। আমরা তখন বল পায়ে নিয়ে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতাম, ‘তাহলে ও কখন পাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে? যখন আমি দৌড়াব তখন, নাকি যখন আমি স্থির দাঁড়িয়ে থাকব তখন?’
আসলে ফুটবল ইতিহাস এই ধরনের যে কয়েকজন অবিশ্বাস্য ফেনোমেনন বা বিস্ময়কর প্রতিভার জন্ম দিয়েছে, তাদের আমাদের দেশের জার্সিতে পাওয়ার জন্য ঈশ্বরের কাছে আমাদের আজীবন কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।