মৃত্যু যেখানে নিত্যসঙ্গী

এক যুগ আগেও যে শিমুলতলী এলাকাটি চিরসবুজ পাহাড়ে ঘেরা এক শান্ত স্বর্গ ছিল, সময়ের নিষ্ঠুর নির্মমতায় সেখানে আজ কেবলই আতঙ্কের ছায়া। ২০১৭ সালের সেই বিভীষিকাময় সকালের কথা মনে হলে আজও রাঙ্গামাটির আকাশ-বাতাস যেন ভারী হয়ে ওঠে। ধসে পড়া পাহাড়ের নিচে চাপা পড়েছিল মানুষের স্বপ্ন, ভালোবাসার সংসার আর নিষ্পাপ কিছু প্রাণ। সেই ভয়াবহ পাহাড়ধসে পুরো রাঙ্গামাটি যখন ১২০ জন মানুষের লাশে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখন শুধু এই শিমুলতলী এলাকাতেই মাটিচাপা পড়ে চিরতরে হারিয়ে যায় ২৫ তাজা প্রাণ! শত শত মানুষের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছিল বাতাস, রক্ত আর কাদামাটিতে মিশে গিয়েছিল সাজানো গোছানো অসংখ্য ঘরবাড়ি। কিন্তু সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা হলো, স্বজন হারানোর সেই বুকফাটা কান্নার ৯টি বছর পার হয়ে গেলেও আজও আমাদের ঘুম ভাঙেনি। বুক কাঁপানো মৃত্যুঝুঁকি জেনেও মানুষ আজ আবার সেখানেই গড়ছে নতুন বসতি।

শিমুলতলী, ভেদভেদী, মনতলা কিংবা মুসলিমপাড়ার পাহাড়গুলোর বুক চিরে আজ আবার হাজারো মানুষ মৃত্যুর সঙ্গে এক ভয়াবহ জুয়ায় মেতেছে। এক বুক আতঙ্ক আর সন্তানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা প্রতি রাতে ঘুমাতে যায়, যেন পরবর্তী কোনো বর্ষার বৃষ্টি তাদের চিরদিনের জন্য ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার অপেক্ষায় আছে।

জেলা প্র্রশাসনের তথ্যমতে, বর্তমানে রাঙ্গামাটিতে ১২৬ এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেখানে প্রায় ৬ হাজার পরিবারের ২০ হাজার মানুষ পাহাড়ে ঝুঁকিতে বসবাস করছে। বর্ষার আগে এসব এলাকায় প্রশাসন সাইনবোর্ড দিয়ে সতকর্তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ভারী বৃষ্টি হলেই পাহাড়ের পদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে তোড়জোড় শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন। বৃষ্টি শেষ হলে আবার সেই আগের অবস্থায় ফিরে আসে সবকিছু। ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিয়ে স্থায়ী কোনো পরিকল্পনা নেই। আর এ কারণেই সমস্যা দীর্ঘতর হচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।

শিমুলতলী এলাকার বাসিন্দা মো. সাব্বির আলী বলেন, মূল শহরে থাকতে গেলে অনেক টাকার প্রয়োজন। আমাদের ইনকামই বা কত? তাই তো বাধ্য হয়ে এখানে অল্প টাকা দিয়ে একটু জায়গা কিনে পরিবার নিয়ে থাকি। সনাতন পাড়ার বাসিন্দা সুমন চৌধুরী বলেন, ‘বৃষ্টি হলে ভয় হয়। তবুও কোথাও যেতে পারি না। বর্ষাকাল ছাড়া আমরা এখানে আরামেই আছি।’

রূপনগর এলাকার খোকন ও হামিদা পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে ঘর নির্মাণ করে পরিবার নিয়ে বসবাস করেছেন। তারা জানান, অন্যত্র যাওয়ার জায়গা না থাকায় মৃত্যু শঙ্কা আছে জেনেও সেখানে রয়েছেন। খোকন আরও বলেন, সরকার আমাদের জায়গা ছাড়তে বলে। আমরা কোথায় যাব? থাকব কোথায়? সেই বিষয়ে তারা কিছুই বলে না। তাই আমরা কোথাও যাব না। বাঁচলে এখানেই বাঁচব, আর মরলে এখানেই মরব।যুব উন্নয়ন এলাকা ও মনতলা আদাম এলাকার বাসিন্দা রবীন্দ্র লাল চাকমা ও সোনা চন্দ্র চাকমা জানিয়েছেন, বর্ষা মৌসুমে জেলা প্রশাসন থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে দিয়ে চলে যায়। পাহাড়কে ঝুঁকিমুক্ত করে বসবাসের উপযোগী করার কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। পরিবেশবাদী সংগঠন গ্লোবাল ভিলেজের পরিচালক হেফাজত সবুজ বলেন, ২০১৭ সালে পাহাড় ধসে অনেক প্রাণহানির পর প্রশাসন থেকে পাহাড়ধসের কারণ ও করণীয় নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটির রিপোর্ট এবং সুপারিশ আমরা আজও জানতে পারিনি। বর্তমান পাহাড়ের চিত্রই বলে দেয় সেই রিপোর্টের সুপারিশ অনুসরণ করা হয়নি। যদি অনুসরণ করা হতো, তাহলে এত বড় একটি ঘটনার পর আবার একই স্থানে বসতি স্থাপন হতো না। সাধারণ মানুষকে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করতে হতো না।

রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, পাহাড়ের পাদদেশে যারা বসবাস করে তাদের অনেকেই অবৈধ দখলদার। এছাড়া পাহাড়ে ভূমি বন্দোবস্তও বন্ধ থাকায় তাদের স্থায়ী পুনর্বাসনে সমস্যা হচ্ছে। তারপরও প্রশাসন থেকে ঝুঁকি হ্রাসে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।