চট্টগ্রাম

কর্ণফুলীতে মহাসড়কের ওপর অবৈধ হাট

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ক্রসিং এলাকায় টানেল সংযোগ সড়কের ওপর সপ্তাহের দুই দিন বসছে অবৈধ হাট। ছয় লেনবিশিষ্ট মহাসড়কের ওপর গড়ে ওঠা এই অবৈধ হাটের কারণে যানজট, জনভোগান্তি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। উপজেলা প্রশাসনের নাকের ডগায় বছরের পর বছর এ অবস্থা চললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা প্রশাসনের হাটবাজার তালিকায় নেই এ হাটের নাম। তবু সপ্তাহের প্রতি শুক্র ও সোমবার মহাসড়কের ওপর বসে এ হাট। হাটের দিন শতাধিক অস্থায়ী দোকানে মাছ, সবজি, ফলমূল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করা হয়। ফলে সড়কের একাংশ কার্যত বাজারে পরিণত হয়।

সোমবার (২২ জুন) সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার শিকলবাহা ক্রসিংয়ের পশ্চিম পাশে কর্ণফুলী টানেল সংযোগ সড়কের প্রায় আধা কিলোমিটারজুড়ে মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি বিক্রি হচ্ছে। কেউ ভ্যানে করে, কেউবা সড়কে পলিথিন বিছিয়ে পসরা সাজিয়ে বসেছেন। হাটের বিভিন্ন দোকানের দখলে থাকায় সড়কের ফুটপাতও প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে সড়কে একই সঙ্গে চলছে গাড়ি ও মানুষের চলাচল।

সপ্তাহের দুই দিন নিয়মিত বসা এই হাট ইজারাভুক্ত না হলেও ইউনিয়ন ভূমি অফিসের মাধ্যমে খাস কালেকশনের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে কত টাকা সরকারি রাজস্ব হিসেবে আদায় হয়, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, খাস কালেকশনের নামে স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ও প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তারা নামমাত্র সরকারি নিয়ম দেখিয়ে রাজস্বের টাকা লুটপাট করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানি বলেন, ‘সড়কে বসে মালামাল বিক্রির কারণে লোকজন ঠিকমতো হাঁটতে পারে না, গাড়িও চলতে পারে না। কিন্তু আমি তো একা নই, সবাই হাটে এসে বেচাকেনা করছে। ভূমি অফিসের লোক এসে আমাদের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে যান। দোকানভেদে ৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।’

শুধু দোকানপাট কিংবা হাটবাজারই নয়, শিকলবাহা ক্রসিংয়ে অবৈধভাবে গাড়ির স্ট্যান্ড গড়ে ওঠা, সড়কের যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং এবং যাত্রী ওঠানামার কারণেও এখানে যানজট সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে শুক্র ও সোমবার সাপ্তাহিক হাটের দিন দুর্ভোগ বহুগুণে বেড়ে যায়। থমকে যায় যানবাহনের চাকা। ইঞ্চি ইঞ্চি করে সামনে এগোয় গাড়ি।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ক্রসিং থেকে আনোয়ারা উপজেলার কালা বিবির দীঘির মোড় পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার কর্ণফুলী টানেল সংযোগ সড়কটি চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের অধীন। ২০২১-২২ অর্থবছরে জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে এ মহাসড়কের নির্মাণকাজ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ সড়কে যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। কারণ, কর্ণফুলী টানেল চালুর পর আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলায় গড়ে উঠছে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা ও পর্যটনকেন্দ্র। এছাড়া টানেল ব্যবহারকারী যানবাহনের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক। ফলে আগের পিএবি সড়কটি সংস্কার করে ছয় লেনে উন্নীত করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আবদুল্লাহ আল নোমান পারভেজ বলেন, ‘সড়ক থেকে অবৈধ হাটবাজার উচ্ছেদের জন্য কর্ণফুলী উপজেলা প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গেও কথা হয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন, সড়কের পাশে কিছু খাস জায়গা রয়েছে, সেখানে বাজারটি সরিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’

মহাসড়ক আইন অনুযায়ী, মহাসড়কের ওপর বা নিয়ন্ত্রণরেখার মধ্যে হাটবাজার বসানোর কোনো সুযোগ নেই। আইনে নিয়ন্ত্রণরেখার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, মহাসড়কের সংরক্ষণরেখা থেকে সরকার কর্তৃক গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্ধারিত রেখাই নিয়ন্ত্রণরেখা। আর আইনের ১২(ঘ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘মহাসড়কের জন্য বা যানবাহন চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা চিহ্নিত করে উচ্ছেদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’

এ বিষয়ে এক আইনজীবী বলেন, স্থানীয় প্রশাসন তাদের জায়গা ইজারা দিতে পারে কিংবা সেখানে বাজার বসাতে পারে। এতে দোষের কিছু নেই। তবে দেখতে হবে, সেটি যেন সড়ক বিভাগের জায়গা না হয় এবং মহাসড়কের ওপর যেন বাজার না বসে।

২০২৪ সালের ১৬ জানুয়ারি নাগরিকদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সারাদেশের সড়ক-মহাসড়কে থাকা অবৈধ স্থাপনা, হাটবাজার ও তিন চাকার যান অপসারণে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। এর আগে একই বছরের ১৪ জানুয়ারি আইনজীবী এস এম বদরুল ইসলাম এ-সংক্রান্ত রিট আবেদন করেন। আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও ইজারাবিহীন একটি হাট কীভাবে মহাসড়কের ওপর বসছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

খাস কালেকশনের দায়িত্বে থাকা শিকলবাহা ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) মৌসুমী বড়ুয়া বলেন, ‘সপ্তাহে দুই দিন হাট থেকে খাস কালেকশন করা হয় এবং মাস শেষে তা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।’ তবে রাজস্বের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ জানতে চাইলে তিনি উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

কর্ণফুলী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আল আমিন হোসেন বলেন, ‘খাস কালেকশনের রাজস্বের টাকা ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে সরাসরি চালানের মাধ্যমে ইউএনও কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়। তবে টাকার পরিমাণ আমার জানা নেই। একেক সময় কমবেশি হতে পারে।’

কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সজীব কান্তি রুদ্র বলেন, ‘অস্থায়ী এই বাজারের কারণে কিছুটা ভোগান্তি হচ্ছে, বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে বাজারটি মহাসড়ক থেকে সরিয়ে উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তরের বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের সঙ্গে আলোচনা চলছে।’

তিনি আরও জানান, বাজারটি ইজারা দেওয়া হয়নি; ইউনিয়ন ভূমি অফিসের মাধ্যমে খাস কালেকশন করা হয়।