শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। আজকের শিশুই আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, শিক্ষক, আলেম, বিজ্ঞানী কিংবা সমাজসংস্কারক হবে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর বহু দেশে যেমন শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, তেমনি আমাদের সমাজেও প্রতিনিয়ত নানা রকম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে অসংখ্য শিশু। কেউ শারীরিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছে, কেউ মানসিকভাবে, আবার কেউ যৌন নিপীড়ন কিংবা অবহেলার শিকার হচ্ছে। এই বিষয়টি পুরো সমাজ ও মানবতার জন্য লজ্জার বিষয়। তাই শিশু নির্যাতন বন্ধে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে একযোগে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
শিশু নির্যাতনের সংজ্ঞা : শিশুর প্রতি এমন কোনো আচরণ, যা তার শারীরিক, মানসিক, নৈতিক বা সামাজিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাই শিশু নির্যাতন। এটি হতে পারে মারধর, গালিগালাজ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, শ্রমে বাধ্য করা, অবহেলা করা কিংবা যৌন হয়রানি। অনেক সময় শিশুর ইচ্ছা, অনুভূতি ও অধিকারকে উপেক্ষা করাও এক ধরনের নির্যাতন।
শিশু নির্যাতনের কারণ : বর্তমানে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শিশুরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। শিশুদের ওপর এই অত্যাচার তাদের কোমল মনকে ভেঙে দেয় এবং ভবিষ্যৎ জীবনকে অন্ধকার করে তোলে। শিশু নির্যাতনের পেছনে নানা কারণ রয়েছে। কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।
পারিবারিক অসচেতনতা : অনেক অভিভাবক মনে করেন, শিশুকে মারধর করলেই সে শান্ত হবে। কিন্তু অতিরিক্ত শাসন শিশুর মনে ভয়, ক্ষোভ ও হীনমন্যতা তৈরি করে।
নৈতিক শিক্ষার অভাব : যে সমাজে ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়ে, সেখানে দুর্বলদের ওপর অত্যাচার বাড়ে। শিশু যেহেতু প্রতিরোধ করতে পারে না, তাই তারা সহজ শিকারে পরিণত হয়।
দারিদ্র্য ও শিশুশ্রম : দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিশু অল্প বয়সে শ্রমে নিযুক্ত হয়। সেখানে তারা মালিক বা সহকর্মীদের নির্যাতনের শিকার হয়।
মাদক ও অপরাধপ্রবণতা : মাদকাসক্ত ব্যক্তি অনেক সময় নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শিশুদের ওপর সহিংস আচরণ করে।
প্রযুক্তির অপব্যবহার : ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারের কারণে শিশুরা সাইবার বুলিং, ব্ল্যাকমেইল ও যৌন হয়রানির শিকার হয়।
শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ প্রভাব : শিশু নির্যাতন একটি শিশুর জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। নির্যাতিত শিশুরা অনেক সময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। তারা আত্মবিশ্বাস হারায়, বিষণœতায় আক্রান্ত হয় এবং সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। অনেক শিশু বড় হয়ে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে কিংবা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। একটি নির্যাতিত শিশু শুধু নিজের জীবনই নষ্ট করে না, বরং তার মাধ্যমে পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ সুস্থ শিশু ছাড়া সুস্থ জাতি গঠন সম্ভব নয়।
ইসলামে শিশুর অধিকার : ইসলাম শিশুদের প্রতি অত্যন্ত সদয় আচরণের নির্দেশ দিয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের ভালোবাসতেন, তাদের সঙ্গে হাসি-আনন্দ করতেন এবং কোমল আচরণ করতেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’
ইসলাম শিশুকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত হিসেবে গণ্য করেছে। তাই শিশুদের প্রতি কঠোরতা, অবহেলা বা নির্যাতন ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ। পিতা-মাতার দায়িত্ব হলো সন্তানকে আদর, শিক্ষা ও নিরাপত্তা দেওয়া। শিশু নির্যাতন বন্ধে যেসব করণীয় রয়েছে তা উল্লেখ করা হলো।
পরিবারে সচেতনতা বৃদ্ধি : শিশুর প্রথম বিদ্যালয় হলো পরিবার। তাই পরিবারে ভালোবাসা, সহানুভূতি ও ধৈর্যের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিশুর ভুল হলে তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে, মারধর নয়।
নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা নিশ্চিত করা : শিশুদের ছোটবেলা থেকেই মানবিকতা, দয়া, সহমর্মিতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ শেখাতে হবে। একইসঙ্গে বড়দের মধ্যেও নৈতিক শিক্ষা জাগ্রত করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ : স্কুল, মাদ্রাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের আচরণ হতে হবে স্নেহপূর্ণ ও দায়িত্বশীল।
শিশুশ্রম বন্ধ করা : দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে শিশুশ্রম কমাতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে শিশুদের নির্যাতন করা হয়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
আইন প্রয়োগ কঠোর করা : শিশু নির্যাতনকারীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও কার্যকর ও সংবেদনশীল হতে হবে।
সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা : সমাজের সচেতন মানুষ, আলেম-ওলামা, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। মসজিদ, স্কুল ও গণমাধ্যমে এ বিষয়ে প্রচার চালাতে হবে।
প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা : শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারে অভিভাবকদের নজরদারি রাখতে হবে। অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে শিশুদের সচেতন করতে হবে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা : গণমাধ্যম শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। টেলিভিশন, পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।
লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর