‘নিশ্চয়ই সব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত’

আপডেট : ২৩ জুন ২০২৬, ০৭:০৭ এএম

সময় নিঃশব্দে বয়ে যায় অদৃশ্য স্রোতের মতো। মানুষ ব্যস্ত থাকে তার স্বপ্ন, পরিকল্পনা, অর্জন ও ব্যর্থতা নিয়ে। কেউ সম্পদ জমায়, কেউ খ্যাতি খোঁজে, কেউ ক্ষমতার পেছনে ছুটে বেড়ায়। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ উপলব্ধি করে, সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ছিল সময়। যা চলে গেলে আর ফিরে আসে না। মহান আল্লাহ সুরা আসরের শুরুতেই সময়ের শপথ করেছেন। এরপর আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই সব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা আসর ২)

এটি একটি বিস্ময়কর ঘোষণা। এখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আলাদা করা হয়নি। বরং সমগ্র মানবজাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত বলা হয়েছে। মানুষ জন্মের পর থেকে প্রতিনিয়ত সময় হারাচ্ছে। তার জীবন থেকে দিন, মাস ও বছর কমে যাচ্ছে। বাহ্যিকভাবে সে যত সফলই হোক না কেন, যদি তার জীবন আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত না হয়, তবে প্রকৃত অর্থে সে ক্ষতিগ্রস্ত।

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অসংখ্য মানুষ ছিলেন, যারা সম্পদ, ক্ষমতা ও খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু তাদের অনেকের জীবন শেষ হয়েছে হতাশা, অস্থিরতা কিংবা ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে। আবার এমন অনেক মানুষও ছিলেন, যাদের বাহ্যিক অর্জন কম ছিল, কিন্তু তারা আল্লাহর কাছে সফল হয়েছেন। কারণ কোরআনের দৃষ্টিতে সফলতার মানদণ্ড ভিন্ন।

সুরা আাসরের তৃতীয় আয়াতে মহান আল্লাহ সেই সফল মানুষের পরিচয় তুলে ধরেছেন। তিনি চারটি গুণের কথা বলেছেন, যা মানুষকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।

প্রথম গুণ হলো ইমান। এটি মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও জীবনবোধকে পরিবর্তন করে। একজন মুমিন জানেন, তার জীবন উদ্দেশ্যহীন নয়। তিনি জানেন, পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং একদিন তাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। এই বিশ্বাস মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।

দ্বিতীয় গুণ হলো সৎকর্ম। ইসলামে শুধু বিশ্বাসই যথেষ্ট নয়, সেই বিশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলনও থাকতে হয়। নামাজ, রোজা, দান-সদকা, মানুষের প্রতি সদাচরণ, সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজ সবই সৎকর্মের অন্তর্ভুক্ত। ইমান হলো বৃক্ষের শেকড়, আর সৎকর্ম হলো তার ফল। শেকড় থাকলেও ফল না হলে যেমন বৃক্ষের পূর্ণতা আসে না, তেমনি আমল ছাড়া ইমানও অপূর্ণ থেকে যায়।

তৃতীয় গুণ হলো সত্যের উপদেশ দেওয়া। ইসলাম মানুষকে শুধু নিজের মুক্তির চিন্তা করতে শেখায় না। একজন মুমিন অন্যের কল্যাণও কামনা করেন। তিনি সত্যকে গ্রহণ করেন এবং অন্যদেরও সত্যের পথে আহ্বান করেন। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায়, সততা ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেন। কারণ সত্যকে শুধু জানা যথেষ্ট নয়, তা প্রচার ও প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও করতে হয়।

চতুর্থ গুণ হলো ধৈর্যের উপদেশ দেওয়া। সত্যের পথে চলা সহজ নয়। জীবনের নানা প্রতিকূলতা, পরীক্ষা ও বাধার মুখোমুখি হতে হয়। নবী-রাসুলদের জীবন এ বাস্তবতার উজ্জ্বল উদাহরণ। তারা অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেছেন, তবুও সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হননি। তাই একজন মুমিনের জন্য ধৈর্য অপরিহার্য। শুধু নিজে ধৈর্য ধারণ করাই নয়, অন্যদেরও ধৈর্যের শিক্ষা দিতে হবে।

এই চারটি গুণের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ইমান মানুষকে সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করে। সৎকর্ম মানুষকে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে শেখায়। সত্যের পক্ষে দাঁড়ালে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। আর সেই পরীক্ষায় টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন ধৈর্য। এভাবেই সুরা আসর একজন মুমিনের পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন তুলে ধরে।

আধুনিক যুগে মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ব্যস্ত। প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে সময়ের অপচয়, মানসিক অস্থিরতা এবং উদ্দেশ্যহীনতা। এমন সময়ে সুরা আসর আমাদের নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়, জীবনের প্রকৃত সফলতা সম্পদ বা খ্যাতিতে নয়, বরং ইমান, সৎকর্ম, সত্যের অনুসরণ এবং ধৈর্যের মধ্যে নিহিত।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত