ব্রিটেন এক সময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে সময়ের পরিক্রমায় ব্রিটেনের রাজনীতি এখন এক চরম সংকটময় সময় পার করছে। মার্গারেট থ্যাচার এবং টনি ব্লেয়ারের মতো নেতা যারা সম্মিলিতভাবে ২১ বছর ক্ষমতায় থেকে আধুনিক ব্রিটেনকে নতুন রূপ দিয়েছিলেন। সেই ব্রিটেনের রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা জেঁকে বসেছে। ফলশ্রুতিতে গত এক দশকে ৬ জন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি যুক্তরাজ্য। দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ ভূমিধস জয় নিয়ে ক্ষমতায় এলেও দুই বছরের মাথায় পদত্যাগ করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ফলে বিগত প্রায় দুই শতাব্দীর মধ্যে দেশটিতে এখন সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ঘটছে।
গত সোমবার সকালে ডাউনিং স্ট্রিটে স্ত্রী ও কর্মীদের পাশে নিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি জানান, ব্রিটেনকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি আর সঠিক ব্যক্তি নন। এর মাধ্যমে গত ১০ বছরের মধ্যে ষষ্ঠ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করলেন স্টারমার। তার পূর্বসূরিদের মতোই স্টারমারও ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দার পর থেকে স্থবির হয়ে পড়া জীবনযাত্রার মান নিয়ে জনগণের ক্ষোভ প্রশমন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তার ওপর কোভিড মহামারীর মতো বৈশ্বিক ধাক্কার কারণে ফুলেফেঁপে ওঠা জাতীয় ঋণ সরকারের ব্যয় করার ক্ষমতাকে অনেকটাই বেঁধে ফেলেছে। পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলায় ব্যর্থতা দেশে গভীর রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করেছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীদের উত্থান-পতন নিয়ে ‘দ্য ইম্পসিবল অফিস’ বইয়ের লেখক ও ইতিহাসবিদ অ্যান্থনি সেলডন রয়টার্সকে বলেন, লিজ ট্রাস এবং বরিস জনসনের মতো স্টারমারও একটি স্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করে জনগণের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস জোগাতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে ব্রিটেন এখন এক গভীর গর্তে পতিত হয়েছে। স্টারমারের সম্ভাব্য উত্তরসূরির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহামও যদি ব্যর্থ হন, তবে ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। বৈশ্বিক আর্থিক সংকট ব্রিটেনকে মারাত্মকভাবে আঘাত করে, কারণ দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত বিশাল আর্থিক খাতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। পরবর্তী সময়ে সরকারি খাতের ব্যয়সংকোচন নীতি দেশকে ভবিষ্যতের সংকটের মুখোমুখি হওয়ার জন্য দুর্বল করে ফেলে।
২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টনি ব্লেয়ারই ছিলেন শেষ প্রধানমন্ত্রী, যিনি কোনো দলের সমর্থন ছাড়া একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পুরো মেয়াদ পার করেছিলেন। এক সময় ব্রিটেন যেখানে ইতালির ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন নিয়ে উপহাস করত, আজ তারা ইতালির জর্জিয়া মেলানির দিকে ঈর্ষার চোখে তাকাচ্ছে, যিনি প্রায় চার বছর ক্ষমতায় থেকে ইতালীয় প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে দীর্ঘতম মেয়াদে সরকার প্রধান হতে চলেছেন। ইনস্টিটিউট অব গভর্নমেন্ট (ইএফজি) থিংক ট্যাংকের সিনিয়র ফেলো ও সাবেক অর্থ মন্ত্রণালয় কর্মকর্তা জিল রাটার বলেন, মানুষ দেখছে তাদের নিজেদের জীবন বা তাদের সন্তানদের জীবনযাত্রার কোনো উন্নতি হচ্ছে না। এবং এরপর থেকে আসা প্রতিটি সরকারই তা পরিবর্তনে ব্যর্থ বলে মনে হয়েছে। ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ব্রেক্সিট ভোট দিয়ে ব্রিটেন তার দীর্ঘমেয়াদি পররাষ্ট্রনীতি ভেঙে ফেলে। পরবর্তী সময়ে কোভিড-১৯ মহামারী এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের আর্থিক প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটেনের জাতীয় ঋণ জিডিপির প্রায় ১০০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
সাবেক সরকারি উপদেষ্টা স্যাম ফ্রিডম্যান তার সাম্প্রতিক বই ‘ফেইলড স্টেট : হোয়াই নাথিং ওয়ার্কস অ্যান্ড হাউ উই ফিক্স ইট’-এ যুক্তি দিয়েছেন, ব্রিটেন অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ এবং এর মূল রাষ্ট্রীয় দপ্তরগুলো সংকট মোকাবিলা করার জন্য আকারে খুবই ছোট। তাছাড়া, ইফজি-এর জিল রাটার এবং ১৯৮৩ সাল থেকে পার্লামেন্টে থাকা ব্রিটেনের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি আইনপ্রণেতা রজার গেল মনে করেন, ব্রিটিশ রাজনীতির সংস্কৃতি আরও খারাপ হয়েছে। কনজারভেটিভ আইনপ্রণেতা গেল রয়টার্সকে বলেন প্রচুর আইন তৈরি হচ্ছে, যার বেশিরভাগই খারাপ এবং বাজেভাবে খসড়া করা। আমাদের আরও পরিপক্ক সরকারের প্রয়োজন।