মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচনের সময়ে ছয় মাসে অন্তত ৭০২ জন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী। নিহতদের মধ্যে ১৫৩ শিশু ও ২২৪ জন নারীও রয়েছেন। সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনী নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারির শেষ দিকে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়া পর্যন্ত এই সহিংসতা চালানো হয়। সহিংসতার শীর্ষবিন্দু ছিলÑ সাগাইং অঞ্চল, যেখানে এককভাবে ১৯১ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে ৩০ শিশু এবং ৬০ জন নারী।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি বিশ্বস্ত সূত্রের বরাতে নিশ্চিত করেছেন, এই ৭০২ জন বেসামরিক নাগরিক মৃত্যুর প্রত্যক্ষ দায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর। প্রতিবেদনে বিমান হামলাকে ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক দুর্ভোগের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘যুদ্ধবিমান, ড্রোন, প্যারামোটর ও জাইরোকপ্টার ব্যবহার করে চালানো হামলায় অন্তত ৫০৫ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহত সংখ্যার ৫৭ শতাংশ। নিহত এসব ব্যক্তির মধ্যে ১৭৫ জন নারী ও ১১২টি শিশু। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত অক্টোবর মাসে সাগাইংয়ের চাউং-উ এলাকায় একটি বিদ্যালয়ের সামনে উৎসবমুখর পরিবেশের ওপর জান্তা বাহিনী বোমাবর্ষণ করে। চার শিশুসহ ২৩ জন সাধারণ মানুষ সেখানে নিহত হন। এ ছাড়া ডিসেম্বর মাসে তাবায়িন এলাকার একটি চা দোকানে ফুটবল ম্যাচ দেখার সময় বিমান হামলায় ১৯ জন মারা যান।
এ ছাড়াও রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর আরাকান আর্মির নির্যাতনের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। যারা একদিকে হত্যাকাণ্ড, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে, অন্যদিকে আরাকান আর্মিতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভালকার তুর্ক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, মিয়ানমারের সাধারণ মানুষ যেমন সেনাবাহিনীর তীব্র নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তেমনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তহবিল ও মনোযোগ কমে যাওয়ায় তাদের মানবিক দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করছে। তবে মুখপাত্র জোর দিয়ে বলেন, এর অর্থ এই নয় যে অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় কোনো বেসামরিক মানুষ হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এ প্রতিবেদন শুধু জাতিসংঘের হাতে থাকা নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। এটা মোট হতাহতের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নয়।
২০২১ সালে অং সান সু চি প্রশাসনকে সরানোর মাধ্যমে মিয়ানমারের ক্ষমতা দখল করে জেনারেল মিন অং হøাইংয়ের নেতৃত্বধীন সেনাবাহিনী। এক বছরের মধ্যে নির্বাচনের ঘোষণা দিলেও পাঁচ বছর পর বেসামরিকভাবে ক্ষমতায় আসতে গত বছরের ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে কয়েক দফায় নির্বাচনের আয়োজন করে জান্তা সরকার। এই নির্বাচনে দেশটির সংসদের নিম্নকক্ষের ২৬৩টি আসনের মধ্যে ২৩২টিতে এবং উচ্চকক্ষের ১৫৭টি আসনের মধ্যে ১০৯টিতে জয়লাভ করে একক আধিপত্য নিশ্চিত করে জান্তা সমর্থিত দল ইউএসডিপি। পরবর্তী সময়ে গত ৩ এপ্রিল পার্লামেন্টে এক পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে অভ্যুত্থানের মূল নায়ক এবং সেনাপ্রধান মিন অং হøাইং দেশের নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।