বজ্রের পর গোলের ঝড় এমবাপ্পের

প্রকৃতির তাণ্ডব আর ফুটবলের রোমাঞ্চ। একই রাতে দুই বৈপরীত্যের সাক্ষী হলো বিশ্বমঞ্চ। ঝড়-বৃষ্টির কারণে দীর্ঘক্ষণ থমকে থাকা ম্যাচে শেষ পর্যন্ত আলো ছড়ালেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। তার জাদুকরী পারফরম্যান্সে ইরাককে ৩-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশ নিশ্চিত করেছে সাবেক চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। নিজের শততম আন্তর্জাতিক ম্যাচটিকে এমবাপ্পে রাঙালেন জোড়া গোলে, যা ফরাসিদের নকআউট পর্বের টিকিট এনে দেওয়ার পাশাপাশি রেকর্ড বইয়ের পাতাতেও ঝড় তুলেছে।

তবে ম্যাচটির ভাগ্য শুধু ফুটবলারদের পায়ে নয়, নির্ধারিত হয়েছে আকাশের মেজাজের ওপরও। প্রথমার্ধের খেলা শেষে যখন দুই দল মাঠ ছাড়ে, তখনই হানা দেয় তীব্র বজ্রঝড়। ফলে প্রায় দুই ঘণ্টা লকার রুমেই বন্দি থাকতে হয় খেলোয়াড়দের। মাঠের জমে থাকা জল সরাতে সরাতে স্টেডিয়ামের ঘড়িতে তখন প্রায় তিন ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ ও মানসিক ধকলের বিরতিও যে ফরাসিদের মনঃসংযোগে এতটুকু ফাটল ধরাতে পারেনি, তার প্রমাণ মেলে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই। সেই সুর ধরে ম্যাচ শেষে ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম বলেন, ‘প্রথমার্ধটা দুর্দান্ত ছিল। কিন্তু বিরতির পর এত বড় একটা ধাক্কার পরও আমরা যেখানে শেষ করেছিলাম, ঠিক সেখান থেকেই শুরু করতে পেরেছি। ম্যাচটা পুরোপুরি আমাদের নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ ছিল না, তবে ছেলেরা সেটা করে দেখিয়েছে।’

ম্যাচের ১৪ মিনিটেই এমবাপ্পের এক অনবদ্য গোল ফ্রান্সকে এগিয়ে দেয়। মাইকেল অলিসের পাস থেকে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ডি-বক্সের প্রান্ত থেকে ডানপায়ের এক বুলেট গতির শটে ইরাকি গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন তিনি। এরপর ম্যাচের নাটকীয় বিরতি শেষে ৫৪ মিনিটে ইরাকের এক রক্ষণাত্মক ভুলের সুযোগ নিয়ে নিজের দ্বিতীয় এবং দলের হয়ে সহজ ট্যাপ-ইন গোলটি করেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড। এর ১২ মিনিট পর অলিসের নিখুঁত পাস থেকে বল জালে জড়িয়ে দলের হয়ে দ্বিতীয় গোলটি করেন প্রথম ম্যাচের পর তীব্র সমালোচনার মুখে থাকা উসমান দেম্বেলে। তার ফর্মে ফেরায় স্বস্তি প্রকাশ করে দেশম জানান, দেম্বেলের ওপর সবসময়ই পূর্ণ আস্থা ছিল।

এই জোড়া গোলের পর বিশ্বকাপের মঞ্চে কিলিয়ান এমবাপ্পের মোট গোলসংখ্যা দাঁড়াল ১৬-তে। যার মাধ্যমে তিনি ছুঁয়ে ফেললেন জার্মানির সাবেক কিংবদন্তি মিরোস্ল্যাভ ক্লোসাকে। একই রাতে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে লিওনেল মেসির করা ১৮ গোলের রেকর্ডের ঠিক পেছনেই এখন অবস্থান করছেন ২৭ বছর বয়সী এই ফরাসি তারকা। একই সঙ্গে চলতি বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটের দৌড়েও ৫ গোল করা মেসির ঠিক পরেই যেন ওত পেতে আছেন ৪ গোল করা এমবাপ্পে।

এদিকে পর পর দুই ম্যাচে হালান্ড এবং এমবাপ্পের মতো দুই বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারের গোলবন্যার শিকার হয়েও এখনই হাল ছাড়ছেন না ইরাকের অস্ট্রেলিয়ান কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড। প্রথম ম্যাচে নরওয়ের কাছে ৪-১ ব্যবধানে হারের পর ফ্রান্সের বিপক্ষেও এই হার তাদের খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তবে নকআউট পর্বে যাওয়ার জন্য সেরা আটটি তৃতীয় স্থান অধিকারী দলের সুযোগ থাকায় সেনেগালের বিপক্ষে শেষ ম্যাচটিকে ফাইনাল মানছেন তিনি। আর্নল্ড বলেন, ‘আমাদের স্বপ্ন এখনো বেঁচে আছে। সব মনোযোগ এখন সেনেগাল ম্যাচের দিকে।’

লকার রুমের দীর্ঘ অপেক্ষার ধকল কাটিয়ে মাঠের লড়াইয়ে ফ্রান্সের এই আধিপত্য প্রমাণ করে যে, বিশ্বমঞ্চে ট্রফি ধরে রাখার মিশনে তারা কতটা সুশৃঙ্খল এবং মরিয়া। আগামী শুক্রবার গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াইয়ে নরওয়ের মুখোমুখি হবে ফরাসিরা, যেখানে ফুটবলপ্রেমীরা মুখিয়ে আছে এমবাপ্পে-হালান্ডের অসাধারণ এক দ্বৈরথের অপেক্ষায়।