টেক্সাস থেকে কানসাস সিটি; একই সময়ে দুই মাঠে রেফারি যখন শেষ বাঁশি বাজাবেন, তখন নির্ধারিত হবে বিশ্বমঞ্চের এক মহানাটকীয় ভাগ্য। ‘গ্রুপ এফ’-এর চূড়ান্ত ফিনালের এই ৯০ মিনিটের ওপর কেবল তিনটি দেশের নকআউট টিকিটই ঝুলছে না, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ব্রাজিলের নামও। গ্রুপ পর্বের মারপ্যাঁচে যদি ব্রাজিল নিজেদের গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন বা রানার্সআপ হয়, তবে শেষ ৩২-এর হাইভোল্টেজ মঞ্চে তাদের সরাসরি মুখোমুখি হতে হবে এই ‘গ্রুপ এফ’-এর শীর্ষ অথবা দ্বিতীয় স্থানে থাকা দলটির। ফলে ডাচদের আক্রমণাত্মক ফুটবল, জাপানের নিখুঁত রণকৌশল নাকি সুইডেনের ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টা কার কপালে ব্রাজিলের সেই কঠিন পরীক্ষা জুটছে, তা নিয়ে ফুটবল দুনিয়ায় এখন হিসাব-নিকাশের ঝড়।
জাপানের ইতিহাস ছোঁয়ার পরীক্ষা
টেক্সাসের মাঠে গ্রাহাম পটারের সুইডেনের বিপক্ষে খেলবে জাপান। নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ২-২ ড্রয়ের পর তিউনিসিয়াকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে দুর্দান্ত ফর্মে আছে ব্লুু সামুরাইরা। হাজিমে মোরিয়াসুর দলটি এখন টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। এই ম্যাচে কেবল এক পয়েন্ট পেলেই টানা তিন আসরের মতো নকআউট নিশ্চিত হবে তাদের। শুধু তা-ই নয়, এই ম্যাচে অপরাজিত থাকলে এশিয়ার দ্বিতীয় দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে টানা ৫ ম্যাচ অপরাজিত থাকার অনন্য কীর্তি গড়বে জাপান, যা এর আগে কেবল ১৯৯৮ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া করতে পেরেছিল।
অন্য ডাগআউটে সুইডেন রয়েছে চরম চাপে। তিউনিসিয়াকে ৫-১ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও পরের ম্যাচেই ডাচদের কাছে ৫-১ ব্যবধানে বিধ্বস্ত হয়ে মাটিতে আছড়ে পড়েছে গ্রাহাম পটারের দল। নকআউটে সরাসরি পা রাখতে এই ম্যাচে জয়ের কোনো বিকল্প নেই সুইডিশদের। দলটির তারকা স্ট্রাইকার ভিক্টর গাইওকেরেস অবশ্য বেশ আত্মবিশ্বাসী। আর্সেনালের এই ফরোয়ার্ডের মতে, সব কিছু এখনো তাদের নিজেদের হাতেই রয়েছে।
পরিসংখ্যানও অবশ্য সুইডেনের পক্ষে কথা বলছে; বিশ্বকাপে এশিয়ান দলগুলোর বিপক্ষে কখনোই হারেনি তারা (২ জয়, ১ ড্র)। তবে হেড-টু-হেড রেকর্ডে দুই দল এর আগে মাত্র একবারই মুখোমুখি হয়েছে, ২০০২ সালের সেই প্রীতি ম্যাচটি ১-১ ড্রয়ে শেষ হয়েছিল। সব ছাপিয়ে জাপানিদের বড় শক্তির জায়গা তারা এই টুর্নামেন্টে এখনো কোনো হলুদ কার্ডও দেখেনি এবং শেষ ৭ ম্যাচের ৬টিতেই ক্লিনশিট রেখেছে।
রাজত্ব বনাম সম্মান
কানসাস সিটিতে গ্রুপের অন্য ম্যাচে তিউনিসিয়ার মুখোমুখি হবে টেবিলের শীর্ষে থাকা নেদারল্যান্ডস। সুইডেনকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে উড়তে থাকা ডাচরা বিশ্বকাপে নিজেদের টানা ১৪ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড ধরে রেখেছে, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে যেকোনো দলের জন্য দীর্ঘতম অপরাজেয় যাত্রা।
ডাচ কোচ রোনাল্ড কোম্যানের বড় স্বস্তি স্ট্রাইকার ব্রায়ান ব্রবি। সুইডেনের বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি কোম্যানের আক্রমণভাগের মূল ভরসা হয়ে উঠেছেন। কোডি গাকপোও আছেন চেনা ছন্দে, যিনি বিশ্বকাপে খেলা ৭ ম্যাচে ৬টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন। তবে ডাচদের একমাত্র চিন্তার বিষয় তারা তাদের শেষ ৬ ম্যাচের প্রতিটিতেই গোল হজম করেছে।
তিউনিসিয়ার সঙ্গে হেড-টু-হেড পরিসংখ্যানে নেদারল্যান্ডস ভালোভাবেই আছে। ৩ বারের দেখায় হারেনি এক ম্যাচে (১ জয়, ২ ড্র)। এমনকি বিশ্বকাপে আফ্রিকান দলগুলোর বিরুদ্ধে ডাচদের হারার কোনো রেকর্ড নেই (৪ জয়, ১ ড্র)।
ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ নির্ধারণের শেষ অঙ্ক
বর্তমানে ৪ পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে টেবিলের শীর্ষে নেদারল্যান্ডস, সমান পয়েন্ট নিয়ে গোল সংখ্যায় এক ধাপ পিছিয়ে দ্বিতীয় স্থানে জাপান। ৩ পয়েন্ট নিয়ে ওত পেতে আছে সুইডেন। আজ বৃহস্পতিবার রাতে যদি নেদারল্যান্ডস ও জাপান দুই দলই নিজ নিজ ম্যাচে জয় পায়, তবে গ্রুপের শীর্ষস্থান নির্ধারণ হবে গোল ব্যবধানে। ডাচরা যদি তিউনিসিয়াকে বড় ব্যবধানে হারায়, তবে তারাই হবে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন। আর ব্রাজিল যদি তাদের গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন বা রানার্সআপ হওয়ার সমীকরণ মেলাতে পারে, তবে নকআউটের প্রথম ম্যাচেই ডাচ বনাম সেলেসাওদের এক অতিমানবীয় যুদ্ধ দেখবে বিশ্ব।
আবার জাপান যদি সুইডেনকে হারিয়ে দেয় এবং ডাচরা পয়েন্ট হারায়, তবে ব্রাজিলকে সামলানোর দায়িত্ব পড়বে এশিয়ান জায়ান্ট জাপানের ওপর। সমীকরণ বলছে, গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ব্রাজিলের মতো ভয়ংকর দলের সামনে পড়তে চাওয়ার চেয়ে রানার্সআপ হয়ে কিছুটা সহজ প্রতিপক্ষ পাওয়ার মনস্তাত্ত্বিক খেলাও ডাগআউটে কাজ করতে পারে। কানসাস আর টেক্সাসের মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি তাই ডাগআউটের মগজের লড়াইও নির্ধারণ করবে কার ভাগ্য জুড়ছে ব্রাজিলের সঙ্গে।