একই সময়ে দুই গল্প, মেক্সিকোর রাজত্ব-দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাস 

ফুটবল টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বের শেষ দিনগুলো মানেই তীব্র উত্তেজনা, যেখানে একই সময়ে দুই মাঠে নির্ধারণ হয় ভিন্ন দুই দলের ভাগ্য। ঘড়ির কাঁটা যখন একই ছন্দে ঘুরছিল, তখন দুই ভেন্যুতে চলল দুই ভিন্ন সমীকরণের লড়াই। এক মাঠে যখন সহ-আয়োজক মেক্সিকো তাদের চেনা দাপট ধরে রেখে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সারছিল, ঠিক একই সময়ে অন্য মাঠে রচিত হচ্ছিল নতুন এক ইতিহাস। চেক প্রজাতন্ত্রকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে শতভাগ জয়ের রেকর্ড নিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে নকআউটে পা রেখেছে মেক্সিকানরা। আর অন্য প্রান্তের স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ে দক্ষিণ কোরিয়াকে ১-০ গোলে স্তব্ধ করে দিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নকআউটের টিকিট কেটেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। এই দুই মাঠের বিপরীতমুখী ফলাফল মিলিয়ে একরাশ হতাশা নিয়ে চেক প্রজাতন্ত্রের বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে, আর ৩ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তিনে নেমে যাওয়া সন হিউং-মিনের দক্ষিণ কোরিয়াকে এখন নকআউটের টিকিট পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে অন্য গ্রুপগুলোর ফলাফলের ওপর।

চেকদের বিদায় করে মেক্সিকোর তিনে তিন

মন্তেরেই স্টেডিয়ামে নামার আগেই নকআউট পর্ব নিশ্চিত ছিল মেক্সিকোর। তবে ঘরের মাঠে ভক্তদের সামনে জেনোভা এক্সপ্রেসের গতিতে কোনো লাগাম টানেননি কোচ হাভিয়ের আগুয়েরে। তবে একাদশে ছিল নতুনত্ব। পাঁচ পরিবর্তন নিয়ে মাঠে নামা মেক্সিকোর মূল আকর্ষণ ছিল ১৭ বছর বয়সী বিস্ময় বালক গিলবার্তো মোরা। ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী ফুটবলার হিসেবে শুরুর একাদশে খেলতে নেমে পুরো ম্যাচেই নিজের পায়ের জাদুতে মুগ্ধ করেন মোরা। প্রথমার্ধে জটলার ভেতর থেকে লিওনেল মেসির মতো তাঁর এক চতুর টার্ন গ্যালারিকে মাতিয়ে তোলে।

প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর দ্বিতীয় অর্ধে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে মেক্সিকো। ৫৫ মিনিটে লেফট-ব্যাক মাতেও চাভেজের একক প্রচেষ্টার এক চমৎকার ফিনিশিংয়ে ডেডলক ভাঙে স্বাগতিকেরা। এর ঠিক ছয় মিনিট পর জর্জ সানচেজের আক্রমণ থেকে বল পেয়ে বক্সে থাকা হুলিয়ান কিনোনিয়োস টুর্নামেন্টে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন। ৭৭ মিনিটে মেক্সিকোর গ্লাভস হাতে মাঠে নামেন ৪১ বছর ছুঁইছুঁই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক গুইলার্মো ওচোয়া, যা তাঁর ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ম্যাচ। দলটির জন্য যেই মুহূর্তটা যেন চরম আবেগের।

এদিকে ম্যাচের যোগ করা সময়ে বদলি নামা আলভারো ফিদালগো চেকদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকলে ৩-০ গোলের বড় জয় নিশ্চিত হয় মেক্সিকোর। ৩ ম্যাচে ৯ পয়েন্ট ও কোনো গোল না খাওয়ার দুর্দান্ত রেকর্ড নিয়ে গ্রুপ সেরা হয়ে মাঠ ছাড়ে তারা।

কোরিয়াকে স্তব্ধ করে দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাস

গ্রুপের অন্য ম্যাচে সমীকরণ ছিল ভিন্ন। নকআউটে যেতে দক্ষিণ কোরিয়ার যেখানে শুধু ১টি পয়েন্ট (ড্র) দরকার ছিল, সেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে জয়ের কোনো বিকল্প ছিল না। ১৯৯৮, ২০০২ এবং ২০১০ বিশ্বকাপে অংশ নিয়েও কখনো গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার হতে না পারা ‘বাফানা বাফানা’রা আজ শুরু থেকেই ছিল মরিয়া। যদিও ম্যাচের দ্বিতীয় মিনিটেই কোরিয়ার কিম মিন-জায়ের এক জোরালো হেড গোললাইন থেকে ক্লিয়ার করে দক্ষিণ আফ্রিকাকে বাঁচিয়ে দেন অব্রে মোডিবা। এরপর ১৯ মিনিটে থাপেলো মাসেকের এক নিশ্চিত গোল রুখে দেন কোরিয়ান ডিফেন্ডার লি গি-হিউক।

দ্বিতীয়ার্ধে কোরিয়ানদের আক্রমণভাগে ধার বাড়াতে বেঞ্চ থেকে অধিনায়ক সন হিউং-মিনকে মাঠে নামান কোচ। তবে কোরিয়া ওপরে উঠে খেলার সুযোগেই কাউন্টার অ্যাটাকে হানা দেয় দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচের ৬৩ মিনিটে তেশপাং মোরেমির এক রক্ষণচেরা পাস বক্সে নিয়ন্ত্রণে নেন থাপেলো মাসেকো। কোরিয়ান ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে বাঁ পায়ের এক নিখুঁত নিচু শটে বল জালের কোণায় জড়ান তিনি। শেষ ২০ মিনিটে কোরিয়া সমতায় ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্পাতকঠিন রক্ষণের সামনে তা ভেস্তে যায়।

রেফারি শেষ বাঁশি বাজাতেই দক্ষিণ আফ্রিকার ডাগআউটে শুরু হয় বন্য উদযাপন। ৫ বছরের কঠোর পরিশ্রমের পর এই ঐতিহাসিক অর্জনে আবেগাপ্লুত কোচ হুগো ব্রুস বলেন, “এটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, ছেলেদের জন্য আমি অত্যন্ত আনন্দিত। শেষ ২০ মিনিট আমার হার্টবিট প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল!”

৪ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় হয়ে আগামী সোমবার লস অ্যাঞ্জেলেসে  রাউন্ড অফ ৩২-এ কানাডার মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকা। এদিকে নকআউটে এখন প্রতিপক্ষ নির্ধারণ হয়নি মেক্সিকোর।