আবাসন খাত

বহুমুখী কল্যাণের কথা ভাবুন

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক-চিন্তক যাকে সাধারণত পাশ্চাত্য দার্শনিক ঐতিহ্যের ভিত্তিস্থাপনকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয় সেই প্লেটো বলেছিলেন, ‘গৃহ হলো এমন এক জায়গা, যেখানে হৃদয়টা থাকে প্রশান্ত।’ হৃদয়ের প্রশান্তি মানেই তো জীবনের শান্তি। গৃহ কিংবা আবাসনের কথা বলতে গেলে স্মরণে আসেন রবীন্দ্রনাথও। তিনি তার ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থের ‘আশা’ কবিতায় বলেছেন, ‘বহুদিন মনে ছিল আশা/ধরণীর এক কোণে/রহিব আপন-মনে;/ধন নয়, মান নয়, একটুকু বাসা/করেছিনু আশা।’ এই বাসার আশা পূরণে দেশের আবাসন খাতের ভূমিকা কতটা ব্যাপক এবং দেশের অর্থনীতিতে এর জোগান কতটা ব্যাপ্ত তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু খাতটি ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নতুন আশঙ্কা।

বহুবিধ প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি দাঁড়ানো আবাসন খাতের সামনে নেতিবাচকতার আরও প্রলম্বিত ছায়া ও মানুষের স্বপ্নের একটি গৃহের আশার পথে ছড়ানো কাঁটার যে চিত্র ২৫ জুন দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তাতে শুধু এই শিল্পসংশ্লিষ্টদেরই নয়, যাদের ফ্ল্যাট কেনার ভাবনা রয়েছে তাদের কপালেও স্বপ্নভঙ্গের ছাপ পড়তে বাধ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন কর প্রস্তাব ভাবনায় ফেলেছে ফ্ল্যাট ও জমির মালিককে। নির্মাণকাজ শুরুর আগেই সাইনিং মানি বা ফ্ল্যাটের মূল্যের বিপরীতে বড় অঙ্কের করের বোঝা বহনের হিসাব কষতে হচ্ছে। এমন হিসাবের জালে আটকে যাচ্ছে অনেক মানুষের স্বপ্নের আবাসন।’ স্বপ্নবান ও ভুক্তভোগীদের যেসব বক্তব্য উঠে এসেছে প্রতিবেদনে, তা এক ধরনের আর্তনাদ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বৈ কিছু নয়। একই সঙ্গে মহানগর-নগর কিংবা শহরে যারা বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, যাদের সারা জীবনের স্বপ্ন থাকে একটি নিজের ঘরের বা ফ্ল্যাটের, তারা পড়েছেন বিপত্তিতে। যারা থাকেন ভাড়া বাড়িতে চাপে পড়বেন তারাও।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্থাবর সম্পত্তি লেনদেনে কর কাঠামোয় বড় ধরনের যে পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে শুধু স্বপ্নবানদের স্বপ্নেরই অপমৃত্যু ঘটবে না, মারাত্মক অভিঘাত লাগবে দেশের অর্থনীতিতে জোগানদানকারীদের ব্যবসায়ও। ব্যবসা অভিঘাতগ্রস্ত হলে, বাড়ি বানাতে কিংবা ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহীদের আগ্রহে ভাটা পড়লে নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্ত হবে জাতীয় অর্থনীতি। এর পাশাপাশি নতুন ধরনের প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতাও দেখা দিতে পারে। কর আদায়ের আগে কর বাস্তবায়নের কাঠামো নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে তা তুড়ি মেরে উড়িয়ে না দিয়ে সরকারকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে যৌক্তিক প্রতিবিধানের তাগিদ আমরা দিই। এই খাতটি নিশ্চয় শুধু ব্যবসায়িক খাতই নয়, উন্নয়নের অন্যতম সহায়ক শক্তিও বটে। দেশের অর্থনীতিতে আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাতের ভূমিকা বিস্তৃত। জিডিপিতে সরাসরি বড় অবদান রাখার পাশাপাশি, এই খাতটি প্রায় ২৬৯টি লিংকেজ বা সহযোগী শিল্পের (যেমন সিমেন্ট, রড, ইট, বিদ্যুৎ এবং আসবাবপত্র) চাকা সচল রেখেছে। এই খাতে বিপুল সংখ্যক দক্ষ, আধা-দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং হচ্ছে। লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। খাতটি দেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, ঋণের উচ্চ সুদের হার এবং নতুন করনীতির কারণে খাতটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, টেকসই নগরায়ণের স্বার্থে সরকার একই সঙ্গে আর্থিক খাত থেকে এই শিল্পের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার প্রয়োজনে জরুরিভাবে ভাবতে হবে এবং সার্বিক স্বার্থে নতুন করনীতি সংশোধনের বিকল্প নেই।

গত প্রায় চার দশক ধরে দেশে আবাসন খাত জাতীয় অর্থনীতিতে তো বটেই, মানুষের স্বপ্ন পূরণে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তা সরকারকে বিস্মৃত হলে চলবে না। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির গতি ফেরাতে আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাতের সংকট দূর করতে নতুন করনীতির যেমন পরিবর্তন জরুরি, তেমনি রড-সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রীর ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি এবং চড়া নিবন্ধন ব্যয়ের লাগাম টেনে এ খাতে বিরাজমান স্থবিরতা কাটানোর উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই। এ খাতের উদ্যোক্তাদের দাবিগুলো আমলে নেওয়াও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন করনীতির আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে যাতে ধ্বংসের মুখে নিপতিত না হয় খাতটি, তা দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে এবং তাতেই হবে মঙ্গল।