বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতি বছর ২৬ জুন দিনটিকে ‘মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয়। এবার এ দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বিশ্বে মাদক সমস্যা : বিদ্যমান সংকট, নতুন চ্যালেঞ্জ এবং উদ্ভাবনী সমাধান’। তরুণ প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য অংশ মাদকের আগ্রাসনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, ক্রমেই মাদকের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত চালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং গতানুগতিক ধারায় মাদক নির্মূল কার্যক্রম খেই হারিয়ে ফেলছে বা বলা যায়, বিদ্যমান মাদক সমস্যার বিপরীতে গৃহীত কার্যক্রম কার্যকর নয়। সুতরাং বাংলাদেশের সুস্থ মানবসম্পদ গঠন ও সার্বিক উন্নয়নে মাদক একটি বড় অশুভ শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। মাদকদ্রব্য, ধূমপান ও তামাক সেবন মানুষের অকাল মৃত্যু এবং স্বাস্থ্যহানির অন্যতম প্রধান কারণ। মাদকাসক্তি একটি রোগ। ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে, দেশে ইয়াবা সেবনকারী শতকরা ৮৫ ভাগই তরুণ যুবসমাজ! আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অনস্বীকার্য যে, তরুণদের মাদকের করাল গ্রাস থেকে বাঁচাতে হলে মাদক নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে ও স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য তরুণদের ধূমপান, মাদকসহ সব নেশা থেকে দূরে থাকা জরুরি। কিন্তু বিভিন্ন পদক্ষেপ সত্ত্বেও থেমে নেই সর্বনাশা মাদকের বিস্তার। মাদকের সঙ্গে জড়িত অসাধু চক্র যুবসমাজকে ধ্বংসের দারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। তরুণদের মাদকের রাজ্যে টানতে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করছে অসাধু মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিরা। গোয়েন্দা সংস্থার পরিসংখ্যানে জানা যায়, সারা দেশে মাদককারবারির সংখ্যা ২০ হাজার ৮৯১। এর মধ্যে গডফাদার ১ হাজার ৬২০, পাইকারি কারবারি ৬ হাজার ২২৭ এবং খুচরা কারবারি ১৩ হাজার ৪৪। চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ৩০৯ জন গডফাদার রয়েছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ব্যবহার করে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, সিলেট ও আশুগঞ্জ থেকে বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী জাহাজ, ট্রলার, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে মাদক আনা হয়। এ ক্ষেত্রে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
মাদকাসক্তির প্রভাবে হত্যা, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অপরাধ বাড়ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য হতে জানা যায়, ২০২২ পূর্ববর্তী ১০ বছরে নেশাখোর সন্তানের হাতে প্রায় ২০০ বাবা-মা খুন হয়েছেন, স্বামী হত্যা করেছে স্ত্রীকে, স্ত্রী হত্যা করেছে স্বামীকে। খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ, পরকীয়া প্রেম, দাম্পত্য কলহসহ সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মূলেই রয়েছে মাদকের নেশা। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব কিন্তু, সেই মানুষ মাদকের নেশায় হয়ে উঠে হিংস্র দানব, নরপশু। মিরপুরে শিশু রামিসা হত্যা সাম্প্রতিক সময়ের একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা। জানা গেছে, হত্যাকারী সোহেল মাদকসেবী ছিলেন। মাদকাসক্তির বিস্তারের ফলশ্রুতিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সুতরাং সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। বর্তমান সরকারপ্রধান মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন, যা নির্বাচন তফসিলেও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ঘোষণা দিয়ে সাড়া জাগানো মাদকবিরোধী অভিযান দেখা যায়নি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। এর ব্যাপারে সরকারের যথেষ্ট দৃষ্টি রয়েছে এবং তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া আছে। অপরদিকে আগ্রাসী মাদক পাচার রুখতে সীমান্তে কড়া নজরদারি রয়েছে, যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বিবৃতি ও বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন।
অভিযোগ আছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো মাদকদ্রব্য বিক্রি, কৌশলী প্রচার ও ক্রেতা আকর্ষণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই মাদকের বিস্তার রোধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কঠোর নজরদারি জোরদার করা জরুরি। এ লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সাইবার সক্ষমতা বৃদ্ধি, মাদকসংক্রান্ত পোস্ট, পেজ, গ্রুপ ও অ্যাকাউন্ট দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের (যেমন : বিটিআরসি, আইসিটি বিভাগ, সাইবার নিরাপত্তা) সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করতে হবে। বেকারত্ব, দারিদ্র্য, সামাজিক অস্থিরতা, মাদকের বিস্তার, সামাজিক অবক্ষয় এবং শিক্ষার মানের অবনতিসহ বিভিন্ন কারণে মানুষের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাদকের উৎপাদন, পাচার ও অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তরুণদের জন্য সুস্থ সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ, মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তির স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং অনেককে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়তে প্ররোচিত করে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব আমাদের সন্তান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিকভাবে পথ-নির্দেশনা দিয়ে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। সমাজে অনেক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি আছে, যারা নিজ উদ্যোগে এ বিষয়ে কাজ করছে। মাদকাসক্তির চিকিৎসায় সরকারকে আরও বিনিয়োগ করতে হবে।
বর্তমানে সারা দেশে সরকারিভাবে ৬টি বেসরকারিভাবে ৩৮০টি মাদক নিরাময়কেন্দ্র রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক মানসম্মত পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং বিদ্যমান সেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এসব কেন্দ্রে শুধু মাদক থেকে বিরত রাখাই নয়, বরং পরিকল্পিত পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষা, মানসিক সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। মাদকের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে যূথবন্ধভাবে। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর জন্য নিজ নিজ ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোকে কাউন্সেলিং ও নৈতিক দিকনির্দেশনার সুযোগ নিশ্চিত করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে পুনর্বাসিত ব্যক্তিরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে সমাজ ও রাষ্ট্রে দায়িত্বশীল ও উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।
লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা একুশে পদকপ্রাপ্ত শব্দসৈনিক
prof.arupratanchoudhury@yahoo.com