আমার নানা মরে যান সাতানব্বই বছর বয়সে। মরে যাওয়ার পর প্রিয় মানুষের মৃত মুখ আমার দেখতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু তার মুখটা একবার দেখার জন্য কাঙালপনা কাজ করতে থাকল।
সেদিনের রাস্তাঘাট, লোকজন সবকিছু নজরে আসছিল। ফাঁকা রাস্তাতেও বাসের গতি ছিল ধীর। যমুনা পার হয়ে গাড়ি নিজ গতিতে চলতে শুরু করেছিল, তবুও পথ ফুরাচ্ছিল না। বিপদের মুহূর্ত, শোকের বিকেলগুলো সম্ভবত এ রকমই হয়।
আমার বাস আমাকে বগুড়া পার করতে পারল না। মাগরিবের আজান হলো। মা ফোন করে জানালেন, নামাজের পরে মাটি হবে। ঝিম মেরে বসে আছি। বাসের জানালা দিয়ে মাঝিরা বাজারটাকে দেখছি।
একটা বৃদ্ধ লোক কমলা বিক্রি করছে। নানাজানের মতো করে শরীরে চাদর পেঁচিয়ে রেখেছে লোকটা। বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল, কিন্তু কান্না এলো না। মনে হলো, নানাদের গ্রামের বাড়ির উঠানটাতে নানাকে গোসল করানো হচ্ছে। বাড়িতে আগরবাতি জ্বলছে।
যখন পৌঁছালাম, তার অনেক আগেই দাফন কাফন শেষ হয়ে গেছে।
নানির পাশে বসে ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল নিজেকে। কিছু সময় আছে, যখন সান্ত¡না দেওয়ার মতো শব্দ থাকে না। সঙ্গী হারানো মানুষের শোক সেই বোঝে, যে সদ্য কিছু হারায়।
পুরো বাড়ি এত থমথমে আগে কখনো দেখি নাই আমি। মুখে পানির ঝাপটা দিলাম। গোসল সারলাম। হাতে মুখে সাবান দিতে বারণ করল সবাই। বলল, আজ আমাদের শোকের রাত। তিন দিন মুখে গায়ে সাবান, সুগন্ধি দেওয়া যাবে না। চুল আঁচড়ানো যাবে না। চুলায় আগুন জ্বালানো যাবে না।
পাশের বাড়ি থেকে ভাত এসেছে।
একটা বাসনে অল্প ভাত নিয়ে ডিম দিয়ে মাখলাম। এক গাল ভাত মুখে দিতেই মনে হলো, নানাটা মরে গেল! তাকে শেষ দেখা দেখতে পারলাম না! সে একা একা কবরে শুয়ে আছে, আমরা ভাত খাচ্ছি! ভাত গলা দিয়ে নামল না।
সে রাতে কেউ বিছানায়, কেউ মেঝেতে শুয়ে থাকলাম। শীতের রাতের শোক খুব সাংঘাতিক। অবশেষে রাতটা শেষ হলো। ফজরের আজান স্পষ্ট হয়ে কানে বাজল।
নানার কবর দেখতে গেলাম ভোরে।
কবরে তরতাজা মাটি, খেজুরের সতেজ ডাল, গোলাপজলের বোতলটার মুখ খোলা। এসব সহ্য করা অসম্ভব। পায়ের তলার মাটি টলতে লাগল।
নানার শিয়রের পাশে দাঁড়িয়ে ছোটখালা বললেন, ‘আব্বা ভালো থাকেন।’
এই বাক্যটার ভার আমাদের কাউকেই স্থির
থাকতে দিল না। সবাই একসঙ্গে শব্দ করে কাঁদছি। এতদিন তার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আমরা বিদায় নিয়েছি। আজ কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বিদায় নিতে হচ্ছে।
আমার মা নানার বড় মেয়ে। যে মানুষটা অনেক শখ করে বড় মেয়েকে ‘বকুল’ নামে ডাকত, সে তাকে ‘বকুল’ নামে ডাকবে না—এটা ভাবতে গিয়ে বুকের ভেতরটা মোচড়াতে থাকল। মানুষ চলে গেলে নাম ধরে ডাকার মতো কেউ থাকে না মানুষের।
মনে মনে প্রিয় মানুষগুলোর দীর্ঘ জীবন চাইলাম।
২.
আমি ল্যাজারাস সিনড্রোমে বিশ্বাস করি।
ল্যাজারাস সিনড্রোম হচ্ছে এমন একটি ঘটনা, যেখানে কোনো মানুষকে মৃত ঘোষণা করার পর সে পুনরায় জেগে ওঠে। অর্থাৎ আমি জানছি, আমার সবচেয়ে কাছের মানুষটি এই মুহূর্তে মৃত। তার দাফনের আয়োজন করছি। ঠিক সেই মুহূর্তে মানুষটি যদি নড়ে চড়ে ওঠে, মানুষটি যদি কেঁদে ওঠে, যদি সে আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়, আবার বেঁচে ফেরে আমাদের মাঝে, সেটিই ল্যাজারাস সিনড্রোম।
এই ঘটনাটি নতুন কিছু নয়।
ল্যাজারাস সিনড্রোমকে নথিবদ্ধ করা হয় ১৯৮২ সালে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ জানায়, মৃত্যু কোনো একটি ঘটনা নয়, বরং এটি একটি প্রক্রিয়া।
ল্যাজারাসের মূল সূত্রপাত বাইবেল থেকে। আমরা অনেকেই জানি, বাইবেল অনুসারে যিশু ল্যাজারাসকে মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করেছিলেন।
তিনি ল্যাজারাসের কবরের কাছে গিয়ে অনুসারীদের বলেছিলেন, পাথর সরিয়ে ল্যাজারাসকে ডাকো।
যিশুর অনুসারীরা ল্যাজারাসকে ডেকেছিল। তারা বলেছিল, ‘Lazarus, come forth!’
ল্যাজারাস উঠে এসেছিল কবর থেকে।
কোরআন শরিফের সূরা আলে ইমরানে ঈসা (আ.)-এর মুজিজা হিসেবে মৃতকে জীবিত করার কথা বলা হয়েছে। সেখানে ল্যাজারাসের নাম উল্লেখ করা হয়েছে কিনা, আমার জানা নেই।
নানা মরে যাওয়ার পর, তিনি কখনো বেঁচে ফিরতে পারেন কিংবা তার বেঁচে ফেরা উচিত—এসব কখনোই মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে, আমার মা এবং খালারা ভাগ্যবতী।
আমার মাথায় ল্যাজারাস সিনড্রোম ঘুরতে শুরু করে নিলু-নিতুর বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে। ওদের বাবার স্ট্রোক হলো দুপুরবেলা। সারারাত হাসপাতালে থাকলেন। পরদিন ওদের বাবা আর হাত পা নাড়ালেন না। রাত ২টার দিকে মারা গেলেন।
মুহূর্তের মধ্যে মনে হলো, এটা মোটেও ঠিক কিছু হলো না। চলে যাওয়ার সময় এখন নয়। তার ফিরে আসা উচিত।
সারাটা রাত ঘোরের ভেতর কাটল।
জোহরের নামাজের পর মাটি হলো।
কবরস্থ হওয়ার পরে ল্যাজারাস পৃথিবীতে ফিরলেও নিলুর বাবা ফিরলেন না।
৩.
পিছুটান খুব অদ্ভুত জিনিস।
আম কাঁঠালের মৌসুম চলে এসেছে। নানা কাঁঠাল পছন্দ করতেন। তিনি চলে যাওয়ার পর আমার মা কাঁঠাল ছুঁয়ে দেখেননি।
নিলু-নিতুদের মনের অবস্থা আরও ভয়ংকর। আমি জানি। প্রিয় মানুষ চলে গেলে হাত ধরে চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া আর কোনো সান্ত¡না জানি না।
নানার মতো দীর্ঘ জীবন কিংবা নিলু-নিতুদের বাবার মতো অল্প জীবন আমি চাই না। পিছুটানহীন মৃত্যু সুন্দর।
আমার বিশ্বাস, আষাঢ়ের কোনো এক বজ্রপাতে আমি মরে যাব।
এমন মৃত্যু আমার সবচেয়ে পছন্দের।