বঙ্কিমের মুসলিম বিরোধিতার পাটাতন

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এমন এক সময়ে লিখেছিলেন, যখন ভারত ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খুবই সীমিত ছিল। বঙ্কিমচন্দ্র ব্রিটিশ সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বিদ্রোহ বা তীব্র সাহিত্যিক আক্রমণ করলে চাকরি, প্রকাশনা এমনকি ব্যক্তিস্বাধীনতাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারত। ফলে তার ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলোতে প্রত্যক্ষভাবে ব্রিটিশবিরোধিতা খুব কম দেখা যায়। এর পরিবর্তে তিনি অতীতের মুসলিম শাসনামলকে পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করে হিন্দু সমাজের আত্মমর্যাদা, বীরত্ব ও জাতীয় চেতনাকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন—এমন ব্যাখ্যা বহু গবেষক দিয়েছেন।

আনন্দমঠ-এ সন্ন্যাসী বিদ্রোহের কাহিনিতে মুসলিম শাসকদের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আবার রাজসিংহতেও মুঘল শাসনের বিরুদ্ধে রাজপুত প্রতিরোধকে স্থান দেওয়া হয়েছে। এসব রচনায় হিন্দু সমাজের বীরত্ব ও আত্মমর্যাদার চিত্র বিশেষভাবে প্রকাশিত। ঔপনিবেশিক শাসনের সীমাবদ্ধ বাস্তবতার মধ্যেই তিনি ইতিহাস ও সাহিত্যের মাধ্যমে আত্মমর্যাদা, ঐক্য এবং দেশপ্রেমের বোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করেন। তার এই সাহিত্যিক প্রয়াস পরবর্তীকালে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আদর্শিক ভিত্তি নির্মাণে উল্লেখযোগ্য প্রেরণা জুগিয়েছিল। একই সঙ্গে বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান অনন্য। তিনি আধুনিক বাংলা উপন্যাসকে সুসংগঠিত রূপ দেন এবং ভাষা, আঙ্গিক ও চরিত্র নির্মাণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তার সাহিত্যকর্ম বাংলা গদ্যের বিকাশ এবং পরবর্তী প্রজন্মের সাহিত্যিকদের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।