আষাঢ়ে গল্প বনাম জাদুবাস্তব গল্প

সেদিন এক বন্ধুর কথায় হঠাৎ মাথায় প্রশ্নটা এলো। আষাঢ়ে গল্পের সঙ্গে ম্যাজিক রিয়ালিজম বা জাদুবাস্তববাদের কোনো সম্পর্ক আছে কি? দুটিকে কি কোনোভাবে পাশাপাশি রেখে দেখা যায়?

‘আষাঢ়ে গল্প’ বাগধারাটির বাংলা অর্থ আমরা স্কুলের বইতে পড়েছি অবিশ্বাস্য বা আজগুবি গল্প। অতিরঞ্জিত করে কোনো ঘটনা বা কাল্পনিক কাহিনি বর্ণনা করাকে বোঝায়। এর সঙ্গে বর্ষাকালের বা আষাঢ় মাসের সম্পর্ক প্রমাণিত না হলেও ধারণা করা হয়, আষাঢ় মাসে এক টানা বৃষ্টির কারণে বাইরে যাওয়ার উপায় থাকে না, তখন লোকজন গালগল্প বা আজগুবি সব গল্প করতে থাকে। এখানে থেকে শব্দবন্ধনীটি আসতে পারে, বা যেমনটি ভাষাবিদ প্রমথ চৌধুরী বলছেন, ‘আষাঢ়ে’ শব্দটি এসেছে ফারসি বা আরবি ‘আজাড়’ শব্দ থেকে, যার অর্থ অমূলক, অকারণ বা নিরর্থক। এই ‘আজাড়’ বা ‘আজাইড়্যা’ শব্দটিই কালক্রমে ‘আষাঢ়ে’ শব্দে পরিবর্তিত হয়েছে।

ব্যক্তিগতভাবে আমি আষাঢ়ে গল্প বলতে যা বুঝে এসেছি, তা হলো এমন সব কাহিনি যা এতটাই বাড়িয়ে বলা হয় যে বাস্তবে কেউ সেগুলো বিশ্বাস করবে না। এমন সব ঘটনা, যা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা যায়, অতিরঞ্জন আছে, বাড়াবাড়ি আছে, কল্পনার দৌড় আছে। অথচ সেই বাড়িয়ে বলার মধ্যেই আছে আনন্দ, হাস্যরস, আছে গল্প বলার এবং শোনার এক আকুতি।

অন্যদিকে ম্যাজিক রিয়ালিজম বা জাদুবাস্তববাদ নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সাহিত্য সমালোচনায়, সেখানে শব্দটির ব্যবহার এতটাই বিস্তৃত হয়ে গেছে যে, কখনো কখনো মনে হয় এর সীমানা সম্ভবত আর স্পষ্ট নেই।

অসাধারণ কোনো ঘটনা যদি সাধারণ জীবনের সঙ্গে মিশে যায়, অনেক সমালোচক সেটিকেই জাদুবাস্তববাদ বলে ব্যাখ্যা করতে চান। কোনো গল্পে ভূত এলো তো সেটাকে ধরা হয় জাদুবাস্তবতা। কোনো উপন্যাসে স্বপ্ন বাস্তবের সঙ্গে মিশে গেল, সেটাও জাদুবাস্তবতা। কোনো লোককথা আধুনিক জীবনের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে নতুনভাবে বলা হলো, জাদুবাস্তবতা। এমনকি কোনো লেখক বাস্তবতাকে নতুনভাবে দেখালে তাকেও অনেক সময় জাদুবাস্তবতা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নটা তৈরি হয় : জাদুবাস্তবতা আসলে কী?

প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে এর কাছাকাছি কয়েকটি ধারা বা জনরার দিকে আমাদের তাকানো দরকার।

ফ্যান্টাসি এমন এক সাহিত্যধারা যেখানে লেখক সচেতনভাবে একটি ভিন্ন জগৎ নির্মাণ করেন। সেই জগতের নিয়ম আমাদের বাস্তব জগতের নিয়ম থেকে আলাদা হতে পারে। সেখানে ড্রাগন থাকতে পারে, জাদুকর থাকতে পারে, অদ্ভুত প্রাণী থাকতে পারে, দৈত্যদানব থাকতে পারে। পাঠক শুরু থেকেই জানেন যে তিনি বাস্তব জগতের মধ্যে নেই। সেটিই অবাস্তব। উদাহরণ হিসেবে নারনিয়া বা অ্যালিস ইন দ্য ওয়ান্ডারল্যান্ড উপন্যাস বা সিনেমার কথা বলতে পারি।

পরাবাস্তববাদ বা সুররিয়ালিজমের লক্ষ্য ভিন্ন। তা কোনো বিকল্প জগৎ নির্মাণ করতে চায় না। বরং স্বপ্ন, অবচেতন মন, অযৌক্তিক সংযোগ এবং মানসিক বাস্তবতাকে প্রকাশ করতে চায়। ফলে সেখানে এমন সব দৃশ্য তৈরি হয়, যা যুক্তির নিয়ম মানে না, কিন্তু স্বপ্নের নিয়ম মানে। মানে সেটা একটা সম্ভাব্য বাস্তবতা তৈরি করে।

জাদুবাস্তবতা সেখান থেকে অন্য জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে বিশ^াস। কোনো সম্প্রদায়, কোনো অঞ্চল, কোনো জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বিশ^াস, লোককথা, ধর্মীয় কল্পনা, পূর্বপুরুষের স্মৃতি কিংবা পৃথিবীকে দেখার নিজস্ব পদ্ধতির সঙ্গে মিশে আছে। আপাত অলৌকিক বা অপ্রাকৃত অথবা অব্যাখ্যাত কোনো বিশ^াস যখন দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে থাকে যে মানুষ তাকে অস্বাভাবিক বলে মনে করে না, তখন জাদুবাস্তবতার জন্ম হয়।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লেখক পাঠককে ধোঁকা দিতে চান না। তিনি অতিরঞ্জন করে হাসাতেও চান না। তিনি এমন একটি বাস্তবতা তুলে ধরেন যা তার চরিত্রদের কাছে সত্য। এমনকি তার পাঠকও সত্য বলে জানেন বা যাপন করেন।

জাদুবাস্তবতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই একটি বিষয় ভুলে যাই। আমরা ধরে নিই বাস্তবতা একটিই। যেন পৃথিবীর সব মানুষ একই বাস্তবতার মধ্যে বাস করে। কিন্তু সত্যিই কি তা-ই? মেক্সিকান কিংবা আফ্রিকার একজন মানুষের কাছে যা বাস্তব, একজন বাংলাদেশির কাছে তা বাস্তব নাও হতে পারে। আবার উল্টোটাও ঘটতে পারে।

কিছুদিন আগে আফ্রিকায় মাসাইদের সঙ্গে কয়েকটি রাত কাটানোর সুযোগ হয়েছিল। গভীর রাতে আমরা তাদের গবাদিপশুর কাছাকাছি বসেছিলাম। দূরে সিংহের গর্জন শোনা যাচ্ছিল। হাতে ছিল তাদের নিজেদের তৈরি মদ। গল্প করতে করতে তাদের একজন নেতা আমাকে বললেন, তারা জাদু জানেন। আমি জানতে চাইলাম, কী ধরনের জাদু? তিনি পাশের একটি গরুর দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, ধরো এই গরুটি হারিয়ে গেল। সিংহের সামনে গিয়ে পড়ল। আমরা তখন এমন এক জাদু করব যে সিংহেরা গরুটিকে আর গরু হিসেবে দেখবে না। তারা তাকে আরেকটি সিংহ বলে মনে করবে। তখন আর তারা তাকে আক্রমণ করবে না। আমরা পরে গিয়ে গরুটিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসব।

বাংলাদেশে এই গল্প শুনলে অনেকেই হয়তো বলবেন, এ তো আষাঢ়ে গল্প! ইউরোপের কোনো পাঠক হয়তো বলবেন, এটি ফ্যান্টাসি! কেউ কেউ একে কুসংস্কারও বলতে পারেন। কিন্তু মাসাইদের কাছে এটি গল্প নয়। তাদের যাপিত বাস্তবতার অংশ।

একই বিষয় মেক্সিকোতেও দেখা যায়। প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ মৃত আত্মীয়স্বজনদের স্মরণ করতে কবরস্থানে যান। তারা খাবার নিয়ে যান, পানীয় নিয়ে যান, সংগীত নিয়ে যান। সারাদিন তারা মৃতদের সঙ্গে কাটান, তাদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের উপস্থিতি অনুভব করেন। আমাদের কাছে তারা মৃত। তাদের কাছে নয়। তাদের কাছে সম্পর্কটি এখনো শেষ হয়ে যায়নি। এটাই জাদুবাস্তবতার মৌল জায়গা।

জাদুবাস্তবতা বাস্তবতার বাইরে যেতে চায় না। বরং বাস্তবতার সংজ্ঞাটিকেই প্রসারিত করে। যে বাস্তবতা একটি জনগোষ্ঠীর কাছে সত্য, সাহিত্য সেই সত্যকে গ্রহণ করে। একজন ইউরোপীয় পাঠকের কাছে যা অবিশ^াস্য, সেটি হয়তো একজন মেক্সিকান, আফ্রিকান বা লাতিন আমেরিকানের কাছে প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা।

এ কারণে এক স্থানের জাদুবাস্তবতা আরেক স্থানে বসিয়ে দেওয়া যায় না। মেক্সিকোর জাদুবাস্তবতা বাংলাদেশে হুবহু জন্ম নেবে না। মাসাইদের জাদুবাস্তবতা ইউরোপে তৈরি হবে না। কারণ এটা কোনো লিটারারি টেকনিক হিসেবে আবিষ্কৃত হয়নি, এসেছে মানুষের বিশ্বাস থেকে, স্মৃতি থেকে। এসেছে পৃথিবীকে দেখার পদ্ধতির মধ্য থেকে, পৃথিবীকে দেখার পদ্ধতি হিসেবে নয়।

আষাঢ়ে গল্পের অবস্থান ভিন্ন। আষাঢ়ে গল্পের কথক শুরু থেকেই জানেন যে তিনি বাস্তবতার বিবরণ দিচ্ছেন না। তিনি এমন এক গল্প বলতে চাইছেন যেখানে ঘটনার অতিরঞ্জন আছে, বাড়িয়ে বলা আছে, অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার আনন্দ আছে। এর উদ্দেশ্য বাস্তবতার নতুন সংজ্ঞা দেওয়া নয়। এর উদ্দেশ্য গল্প বলার আনন্দ সৃষ্টি করা।

জাদুবাস্তবতা বিশ্বাস থেকে জন্ম নেয়। আষাঢ়ে গল্প জন্ম নেয় অবিশ্বাস থেকে। এই দুই ধারার মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য সম্ভবত এখানেই। এবার আষাঢ়ে গল্পকে পরাবাস্তববাদ এবং ফ্যান্টাসির সঙ্গে একটু তুলনা করে দেখা যেতে পারে। পরাবাস্তববাদ এবং ফ্যান্টাসির সঙ্গে আষাঢ়ে গল্পের সম্পর্ক কিছুটা ভিন্ন।

প্রথমে পরাবাস্তববাদের কথা বলা যাক। পরাবাস্তববাদ বাস্তবতার বাইরে যেতে চায় ঠিকই, কিন্তু এর উদ্দেশ্য অতিরঞ্জন নয়। এর লক্ষ্য মানুষের অন্তর্জগৎ, স্বপ্ন, অবচেতন মন এবং যুক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা অভিজ্ঞতাগুলোকে প্রকাশ করা। ফলে কোনো কোনো আষাঢ়ে গল্প, বিশেষ করে যখন তা মানুষের ভেতরের ভয়, আকাক্সক্ষা কিংবা মানসিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়, তখন তা পরাবাস্তববাদের খুব কাছাকাছি চলে যেতে পারে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাকে পরাবাস্তব সাহিত্য বলাও সম্ভব।

ফ্যান্টাসির সঙ্গে আষাঢ়ে গল্পের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ। কারণ ফ্যান্টাসি শুরু থেকেই পাঠককে বলে দেয়, এখানে বাস্তব জগতের নিয়ম প্রযোজ্য নয়। সেখানে অসম্ভব ঘটনাও স্বাভাবিক। জাদুকর, অদ্ভুত প্রাণী, অলৌকিক শক্তি কিংবা কল্পিত জগৎ—সবকিছুই সেখানে গ্রহণযোগ্য। এই দিক থেকে আষাঢ়ে গল্প ও ফ্যান্টাসির মধ্যে একটি আত্মীয়তা খুঁজে পাওয়া যায়। দুটিই বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করতে দ্বিধা করে না। দুটিই কল্পনার স্বাধীনতাকে স্বীকার করে। তবে এরপরও এ দুটোও এক নয়।

ফ্যান্টাসি সাধারণত একটি সম্পূর্ণ কল্পজগৎ নির্মাণ করে। আষাঢ়ে গল্পের প্রয়োজন ঠিক তা নয়। একটি আষাঢ়ে গল্প গ্রামের চায়ের দোকানে বসেও করা যেতে পারে, উঠানের আড্ডায়ও বলা যেতে পারে। তার শক্তি একটা গোটা জগৎ নির্মাণে নয়, বরং বাড়িয়ে বলায়, অসম্ভবকে আরও অসম্ভব করে তোলায় এবং সেই অতিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে শ্রোতাকে আনন্দ দেওয়ায়।

এ কারণেই আষাঢ়ে গল্পকে ফ্যান্টাসির প্রতিবেশী বলা যেতে পারে, কিন্তু যমজ বলা যায় না। আবার বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে তা পরাবাস্তববাদের সঙ্গেও হাত মেলাতে পারে। কিন্তু তার নিজস্ব পরিচয় শেষ পর্যন্ত আলাদা থেকে যায়।

এবার শুরুর প্রশ্নটিতে ফিরে আসা যাক : আষাঢ়ে গল্প এবং জাদুবাস্তবতার মধ্যে কি কোনো সম্পর্ক আছে?

হ্যাঁ, আছে। অন্তত উপরিভাগে। দুটোর মধ্যেই এমন ঘটনা দেখা যায়, যা সাধারণ বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করে। কখনো কখনো দুটিকে পাশাপাশি রাখলে তাদের মধ্যে মিলও খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কিন্তু যত গভীরে যাওয়া যায়, ততই পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

জাদুবাস্তবতা কোনো সাহিত্যিক কৌশল নয়। এমন এক বাস্তবতার প্রকাশ, যা কোনো জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, স্মৃতি, ইতিহাস এবং পৃথিবীকে দেখার নিজস্ব পদ্ধতির সঙ্গে জড়িত। একজন বহিরাগত যে ঘটনাকে অলৌকিক বলে মনে করেন, সেই একই ঘটনা অন্য কারও কাছে প্রতিদিনের বাস্তবতা হতে পারে। অন্যদিকে আষাঢ়ে গল্পের কথক সাধারণত জানেন যে তিনি বাস্তবতার বিবরণ দিচ্ছেন না। তিনি বাড়িয়ে বলছেন। অসম্ভবকে আরও অসম্ভব করে তুলছেন। কখনো হাসানোর জন্য, কখনো বিস্মিত করার জন্য, কখনো নিছক গল্প বলার আনন্দের জন্য।

এই কারণেই জাদুবাস্তবতা বিশ্বাস থেকে জন্ম নেয়, আর আষাঢ়ে গল্প জন্ম নেয় অবিশ্বাস থেকে।

ফ্যান্টাসি ও পরাবাস্তববাদের সঙ্গে আষাঢ়ে গল্পের কিছু আত্মীয়তা থাকলেও তার নিজস্ব পরিচয় আলাদা। ফ্যান্টাসি কল্পনার জগৎ নির্মাণ করে। পরাবাস্তববাদ মানুষের অন্তর্জগতের দিকে যাত্রা করে। আর আষাঢ়ে গল্প বসে থাকে গল্প বলার আসরে, যেখানে অসম্ভব ঘটনাকে এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলা হয় যে সবাই জানে সেটি সত্য নয়, তবুও শুনতে ভালো লাগে।

জাদুবাস্তবতা মেক্সিকোতে জন্ম নিতে পারে, আফ্রিকার কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে জন্ম নিতে পারে, বাংলাতেও জন্ম নিতে পারে। কিন্তু আষাঢ়ে গল্প পৃথিবীর প্রায় সবখানেই আছে। নাম ভিন্ন হতে পারে, ভাষা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানুষ যখন অসম্ভবকে আরও অসম্ভব করে বলে, যখন বাস্তবতাকে একটু টেনে লম্বা করে, যখন গল্প বলার আনন্দকে উপভোগ্য করে তুলতে চায়, তখনই আষাঢ়ে গল্পের জন্ম হয়।

সেই অর্থে, পৃথিবীর প্রাচীনতম সাহিত্যধারাগুলোর অন্যতম এই ‘আষাঢ়ে গল্প’।