অদম্য সেনাপতি
বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চ ফিফা বিশ্বকাপ যেন কিলিয়ান এমবাপ্পের নিজের চেনা আঙিনা। বৈশ্বিক আসর এলেই ফরাসি এই অধিনায়কের ভেতরের আদিম গোলক্ষুধা শতগুণ বেড়ে যায়। উত্তর আমেরিকায় চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজের চেনা ছন্দ ধরে রেখে প্রথম দুই ম্যাচেই প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠিয়েছেন চারবার। সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করার পর ঝোড়ো আবহাওয়ায় থমকে যাওয়া ফিলাডেলফিয়ার রাতে ইরাকের বিপক্ষেও করেছেন আরও দুই গোল। ম্যাচ শুরুর আগে যখন আকাশে মেঘের ঘনঘটা আর বজ্রপাতের কারণে খেলা প্রায় দুই ঘণ্টা বন্ধ ছিল, তখনো ফরাসি শিবিরের মনোযোগ একটুও নড়েনি। বরং মাঠের লড়াই শুরু হতেই বাম পায়ের মাপা শটে লক্ষ্যভেদ করা কিংবা উসমান দেম্বেলের ক্রস থেকে আলতো ট্যাপ-ইনে বল জালে জড়ানোÑ সব মিলিয়ে এমবাপ্পে যেন আবারও প্রমাণ করলেন, তিনি জন্মই নিয়েছেন এই বড় মঞ্চে আলো ছড়ানোর জন্য।
মঞ্চটা বড় বলেই ইরাকের বিপক্ষের সেই ম্যাচটি এমবাপ্পের ক্যারিয়ারে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে। ২৭ বছর বয়সে তিনি ফ্রান্স জাতীয় দলের হয়ে নিজের শততম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার গৌরব অর্জন করেন, যা ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে ১০০ ম্যাচ খেলার রেকর্ড। শুধু ম্যাচ সংখ্যার সেঞ্চুরিই নয়, এই জোড়া গোলের সুবাদে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফ্রান্সের জার্সিতে ৬০টি গোলের এক অবিশ্বাস্য মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলেন তিনি। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে ১৬-তে, যা তাকে জার্মানির সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকার মিরোসøাভ ক্লোসার পাশে বসিয়েছে। ক্লোসার যেখানে ১৬ গোল করতে লেগেছিল চারটি বিশ্বকাপ, এমবাপ্পে সেটি করে দেখালেন মাত্র তিন আসরেই। এখন তার সামনে কেবল লিওনেল মেসি, যিনি ১৮টি গোল নিয়ে আছেন শীর্ষস্থানে। এটিই মেসির শেষ বিশ্বকাপ হলেও, এমবাপ্পে সামনে অন্তত আরও এক-দুটি আসর খেলবেন। ফলে সবাইকে ছাড়িয়ে গোল স্কোরিংয়ের অনন্য উচ্চতায় ওঠার অপেক্ষায় আছেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড। রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবে যতই চাপ থাকুক না কেন, ফ্রান্সের নীল জার্সিতে তিনি সবসময়ই সম্পূর্ণ মুক্ত, স্বাধীন এবং অপ্রতিরোধ্য। দিদিয়ের দেশমের দলে ওসমানে দেম্বেলে ও মাইকেল অলিসদের মধ্যে তিনিই ফরাসি আক্রমণের মূল চালিকাশক্তি। মাঠের বাঁ প্রান্ত থেকে ক্ষিপ্রগতিতে বল নিয়ে ভেতরে ঢুকে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে যেভাবে তিনি বোকা বানান, তা কোটি ফুটবল ভক্তের হৃদয়ে এক অনন্য নান্দনিকতার সৃষ্টি করে। রেকর্ড গড়া বা ভাঙার চেয়ে তার মূল লক্ষ্য সতীর্থদের সঙ্গে নিয়ে ফ্রান্সকে আবারও ফুটবলের পর্বত চূড়ায় নিয়ে যাওয়া।
ভাইকিং ত্রাস
ফুটবল পরাশক্তিদের দাপটের মধ্যেও কোনো একক খেলোয়াড় কীভাবে একটি সাধারণ দলকে টেনে তুলতে পারে, তার জলজ্যান্ত উদাহরণ আর্লিং ব্রাউট হালান্ড। ২৫ বছর বয়সী এই ম্যানচেস্টার সিটি স্ট্রাইকার নিজের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে এসে উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূলে রীতিমতো ভাইকিংদের মতো তাণ্ডব চালাচ্ছেন। ইরাকের বিপক্ষে জোড়া গোল দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করার পর নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে সেনেগালের বিপক্ষেও করেছেন আরও দুই গোল। সেনেগালের বিরুদ্ধে এক শ্বাসরুদ্ধকর ৫ গোলের থ্রিলারে নরওয়ে যখন ৩-২ ব্যবধানে জয়ী হয়ে ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পা রাখে, তখন সেই আনন্দের প্রধান কারিগর ছিলেন এই দানবীয় ফরওয়ার্ড। দুই ম্যাচে চার গোল করে তিনি প্রমাণ করেছেন, কেন তাকে এই প্রজন্মের সবচেয়ে বিধ্বংসী ‘গোলমেশিন’ বলা হয়।
মাঠের এই বিধ্বংসী রূপের পেছনে অবশ্য লুকিয়ে আছে তার এক আদিম যোদ্ধার সত্তা। ক্লাব ফুটবলে স্রেফ ‘আর্লিং হালান্ড’ নামে পরিচিত হলেও নরওয়ের জার্সিতে তার নামের পেছনে যুক্ত হওয়া ‘ব্রাউট’ শব্দটি কেবল মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা নয়, বরং আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার একচ্ছত্র আধিপত্যেরই জানান দেয়। নরওয়ের জার্সি গায়ে হালান্ডের পরিসংখ্যান যেকোনো ফুটবল পণ্ডিতকে চমকে দিতে বাধ্যÑ মাত্র ৫২ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা এখন ৫৯! দেশের হয়ে শেষ ১২টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের প্রতিটিতেই তিনি জালের দেখা পেয়েছেন, যা তার অতিমানবীয় ধারাবাহিকতার পরিচয় দেয়। শুধু তাই নয়, সেনেগালের বিপক্ষে এই দুই গোলের মাধ্যমে তিনি কেতিল রেকডালের নরওয়ের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ২ গোলের পুরনো রেকর্ড ভেঙে ৪ গোল নিয়ে দেশের সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ স্কোরার হয়ে গেছেন। কোনো চাপ ছাড়া, প্রত্যাশার পর্বতসম বোঝা মাথায় না নিয়ে খেলা এই ভাইকিং ফুটবলার তাই বিশ্বমঞ্চের প্রতিটি মিনিট দারুণভাবে উপভোগ করছেন।
বাইরে শান্ত ও মৃদুভাষী মনে হলেও মাঠের বক্সের ভেতর হালান্ড যে একজন নিখুঁত ঘাতক, তা ফুটবল বিশ্ব খুব ভালো করেই জানে। হালান্ডের খেলার ধরনই চেনা যায় তার অবিশ্বাস্য শারীরিক শক্তি, ক্ষিপ্র গতি আর ডি-বক্সের ভেতর যেকোনো কোণ থেকে গোল করার নিখুঁত ক্ষমতার মাধ্যমে। স্বাভাবিকভাবেই ফ্রান্সের বিপক্ষে গ্রুপ ‘আই’-এর শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে নামার আগে ফুটবল বিশ্ব মুখিয়ে আছে এমবাপ্পে বনাম হালান্ডের এই মহারণ দেখার জন্য, যেখানে প্রতিপক্ষকে ফেবারিট মানলেও মাঠে এক চুলও জমি ছাড়বেন না এই নরওয়েজিয়ান তারকা।