উরুগুয়ের ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে বিয়েলসার বিদায়

লাতিন আমেরিকার অন্যতম ফুটবল পরাশক্তি উরুগুয়ের বিশ্বকাপ মিশন এভাবে ব্যর্থতার চোরাবালিতে হারিয়ে যাবে, তা হয়তো কট্টর সমর্থকেরাও ভাবেননি। ৪৮ দলের বর্ধিত বিশ্বকাপে যেখানে ৩২টি দলই পরের রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, সেখানে গ্রুপ পর্ব থেকেই 'লা সেলেস্তে'দের বিদায় নেওয়া চলতি আসরের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। সৌদি আরব ও নবাগত কেপ ভার্দের মতো দলের বিপক্ষে ড্র করার পর, স্পেনের কাছে ১-০ গোলের হারে গ্রুপ পর্ব থেকেই নিশ্চিত হয় উরুগুয়ের পুড়ো কপাল। আর এই ভরাডুবির পর সমস্ত দায় নিজের কাঁধে নিয়ে একরাশ হতাশা আর তিক্ততা সঙ্গী করে কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন অভিজ্ঞ আর্জেন্টাইন কোচ মার্সেলো বিয়েলসা।

বিদায়লগ্নে সংবাদ সম্মেলনে উরুগুয়ের ফুটবলে নিজের অবদান নিয়ে বিয়েলসা ছিলেন নির্মমভাবে অকপট। কোনো রাখঢাক না রেখেই সত্তর বছর বয়সী এই প্রবীণ কোচ বলেন, “উরুগুয়ের ফুটবলকে আমি কিছুই দিতে পারিনি। কারণ ইতিবাচক ফলাফল ছাড়া তিন বছর ধরে কোনো জাতীয় দলের পেছনে কোচের করা যেকোনো অবদানই শেষ পর্যন্ত বৃথা।”

চারদিকে ধেয়ে আসা সমালোচনার তির নিজের দিকে টেনে নিয়ে তিনি আরও যোগ করেন, “সাংবাদিক, সমর্থক—আপনারা সবাই যা ঘটেছে তার জন্য আমাকেই দোষারোপ করতে চান এবং এই দায় আমার নেওয়া উচিত। এটাই একমাত্র সঠিক কাজ।” 

অথচ এই উরুগুয়ে দলে প্রতিভার কোনো কমতি ছিল না। ফেদেরিকো ভালভার্দে, রদ্রিগো বেন্টানকুর, ম্যানুয়েল উগার্তে এবং ডারউইন নুনেজের মতো বিশ্বমানের তারকাদের নিয়ে গড়া দলটি মাঠে ছিল সম্পূর্ণ দিশেহারা। বল পজিশন কিংবা চাপ তৈরি করলেও, সেটিকে তারা কখনো নিয়ন্ত্রণে বা গোলে রূপান্তর করতে পারেনি। মাঠের এই ব্যর্থতার পেছনে টুর্নামেন্ট জুড়ে চলা অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিয়েলসার বিতর্কিত ফুটবল দর্শনের দিকেই আঙুল তুলছেন ফুটবল বোদ্ধারা।

লুইস সুয়ারেজের মতো সিনিয়র খেলোয়াড়েরাও আগেই বিয়েলসার অতিরিক্ত কঠোর অনুশীলনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। স্থানীয় গণমাধ্যমের দাবি, স্পেনের বিপক্ষে বাঁচা-মরার লড়াইয়ের আগে ভালভার্দে, বেন্টানকুর ও উগার্তেরা কোচের সাথে একটি জরুরি বৈঠকে বসেন। খেলোয়াড়দের অভিযোগ ছিল, অনুশীলনের মাত্রাতিরিক্ত শারীরিক ধকলের কারণে তারা মূল ম্যাচের আগেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন। মাঠের সেই স্নায়ুযুদ্ধের প্রতিফলন দেখা গেছে ম্যাচের কৌশল ও খেলোয়াড়দের আচরণেও। স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে ভুল করে বসা ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ফার্নান্দো মুসলেরা হাফ-টাইমেই নিজে থেকে মাঠ ছাড়ার অনুরোধ করেন। অন্যদিকে, দ্বিতীয়ার্ধে তুলে নেওয়ায় ক্ষোভে নিজের জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে মাঠ ছাড়েন অধিনায়ক ভালভার্দে।

যদিও বিয়েলসা দাবি করেছেন, মাঠের পারফরম্যান্স অনুযায়ী তাদের অন্তত ৭ পয়েন্ট পাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু ভাগ্য সহায় না থাকায় তারা কেবল ২ পয়েন্ট পেয়েছে। তবে এই খোঁড়া যুক্তি উরুগুয়ের মানুষের ক্ষোভ কমাতে পারছে না। ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় তৃতীয় হওয়া এবং বাছাইপর্বে চতুর্থ হওয়া যে এই বড় মঞ্চে কতটা মূল্যহীন, তা স্বীকার করে নিয়ে বিয়েলসা বলেছেন, “আমি একঝাঁক উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন খেলোয়াড় পরিচালনার দায়িত্বে ছিলাম, কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাদের থেকে সেরাটা বের করে আনতে আমি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছি।” উরুগুয়ের ডাগআউট থেকে বিয়েলসার এই বিষাদময় বিদায় এবং লাতিন আমেরিকার একমাত্র দল হিসেবে প্রথম রাউন্ড থেকে ছিটকে যাওয়ার লজ্জা উরুগুয়ের ফুটবল ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবেই লেখা থাকবে।