ফুটবল মাঠে কখনো কখনো শৈল্পিক পাস কিংবা দুর্দান্ত কৌশলের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে স্নায়ুর লড়াই আর টিকে থাকার তীব্র জেদ। ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘এইচ’-এর শেষ ম্যাচে গুয়াদালাহারা স্টেডিয়ামে ঠিক তেমনই এক তীব্র প্রতিদ্বন্দিতাপূর্ণ লড়াই দেখল ফুটবল বিশ্ব। যেখানে মাঠের ফুটবলের চেয়ে উরুগুয়ের আক্রমণাত্মক মেজাজ আর স্পেনের ঠাণ্ডা মাথার নিয়ন্ত্রণই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিল।
মার্সেলো বিয়েলসার উরুগুয়ে যখন টুর্নামেন্টে টিকে থাকার জন্য শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ছিল, তখন স্প্যানিশদের প্রয়োজন ছিল কেবল গ্রুপসেরা হওয়া। শেষ পর্যন্ত ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ উরুগুয়ান কিপার ফার্নান্দো মুসলেরার এক মারাত্মক ভুলে ৪২ মিনিটে আলেক্স বায়েনার করা একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে স্পেন। এই হারে উরুগুয়ানের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিল সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। আর টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড ধরে রেখে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউটে পা রাখল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
ম্যাচের শুরু থেকেই স্পেনের তরুণ উইঙ্গার লামিন ইয়ামালকে বোতলবন্দি করতে উরুগুয়ের রক্ষণভাগ রীতিমতো রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। ম্যাচের প্রথমার্ধে বিয়েলসার শিষ্যরা ফুটবলের চেয়ে শরীরী ফুটবলটাই বেশি খেলেছে। স্পেনের উনাই সিমন ও বায়েনার কিছু ভুলের সুবাদে সুযোগ তৈরি হলেও ফরোয়ার্ড ডারউইন নুনেজেরর গোলবারের সামনে ব্যাকহিল করার অহেতুক চেষ্টা উরুগুয়েকে হতাশ করে।
ম্যাচের ৪২ মিনিটে আসে সেই নাটকীয় ও বিতর্কিত মুহূর্ত। উরুগুয়ের মিডফিল্ডার ম্যানুয়েল উগার্তে চোট পেয়ে মাঠে পড়ে থাকলে স্প্যানিশরা খেলা না থামিয়ে আক্রমণ চালিয়ে যায়। ইয়ামালও ফাউলের শিকার হয়ে মাঠে পড়ে যান, কিন্তু বক্সের মাথায় বল পেয়ে বায়েনার নেওয়া শটটি অভিজ্ঞ কিপার মুসলেরা অবিশ্বাস্যভাবে হাত থেকে ফসকে যেতে দিলে বল জড়ায় জালে। এই এক ভুলেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায়।
বিরতির পর উরুগুয়ে গোল শোধে মরিয়া হয়ে উঠলেও তাদের খেলায় কোনো সৃজনশীলতা ছিল না। ফরোয়ার্ডদের ব্যর্থতায় ম্যাচের ৮০ মিনিটের আগে তারা স্পেনের গোলবারে কোনো অন-টার্গেট শটই নিতে পারেনি। উল্টো ৬০ মিনিটে দলের সেরা তারকা ফেদেরিকো ভালভার্দেকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ায় কোচ বিয়েলসার ওপর ক্ষোভ উগরে দেন এই মিডফিল্ডার। ম্যাচের শেষ দিকে স্পেনের ফেরান তোরেসের একটি শট পোস্টে লেগে ফিরে এলে ব্যবধান বাড়েনি। অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের পাউ কুবার্সিকে এক ভয়াবহ ফাউল করে অগাস্টিন কানোবিও লাল কার্ড দেখলে উরুগুয়ের হতাশা ও ক্ষোভ মাঠের পাশে রূপ নেয় বিশৃঙ্খলা ও হাতাহাতিতে।
ম্যাচ শেষে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে দলের লড়াকু মনোভাবের প্রশংসা করে বলেন, “আজকের ম্যাচটি আমাদের ধৈর্যের বড় পরীক্ষা ছিল। ছেলেরা এমন একটি শারীরিক শক্তির ম্যাচেও মাথা ঠাণ্ডা রেখে পরিস্থিতি সামলে নিয়েছে।”
তবে এই জয়ে স্পেনের জন্য বড় ধাক্কা ইয়েরেমি পিনোর গুরুতর চোট, যার কারণে টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে যেতে হচ্ছে তাকে। অন্যদিকে, উরুগুয়ের বিদায়ের সব দায় নিজের কাঁধে নিয়ে কোচ মার্সেলো বিয়েলসা বলেন, “এই দলটার যে সম্ভাবনা ছিল, তাকে আমি একটি যোগ্য দল হিসেবে মাঠে দাঁড় করাতে পারিনি। এই ব্যর্থতার পুরো দায় আমার।”
গ্রুপসেরা হওয়া স্পেন এখন শেষ ১৬-তে ওঠার লড়াইয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে মুখোমুখি হবে আলজেরিয়া অথবা অস্ট্রিয়ার।