দীর্ঘদিনের খেয়াঘাটনির্ভরতা, অপেক্ষা ও দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার ধল্লা বাজার-সংলগ্ন ধলেশ্বরী নদীর ওপর নির্মিত হয়েছে প্রায় ২৪০ ফুট দীর্ঘ দৃষ্টিনন্দন বাঁশ ও কাঠের একটি সেতু। প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হকের স্মৃতিকে ধারণ করে মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক ফাউন্ডেশন নিজস্ব অর্থায়নে সেতুটি নির্মাণ করেছে।
প্রায় পাঁচ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত এই সেতু চালু হওয়ায় অন্তত ১০ গ্রামের হাজারো মানুষের বহু বছরের যাতায়াত-দুর্ভোগ লাঘব হয়েছে। দৃষ্টিনন্দন হওয়ায় সেতুটি আশপাশের মানুষের কাছে বিনোদনকেন্দ্র হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে।
শনিবার (২৭ জুন) দুপুর ১২টায় সেতুটির উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও অনিবার্য কারণে তিনি উপস্থিত হতে পারেননি। পরে তার পরিবর্তে সাভার থানা বিএনপির সভাপতি হাজী মো. জামাল উদ্দিন সরকার ফিতা কেটে সেতুটির উদ্বোধন করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. আব্দুল মান্নান, সাধারণ সম্পাদক অতিরিক্ত কর কমিশনার মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ সানি, প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হকের জ্যেষ্ঠ পুত্র, সিংগাইর উপজেলা জিয়া মঞ্চের সভাপতি ও ধল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হাজী আব্দুল আল মামুন, ফাউন্ডেশনের সদস্যবৃন্দ, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং বিভিন্ন গ্রামের বিপুলসংখ্যক সুবিধাভোগী মানুষ।
উদ্বোধনের পর সেতুর দক্ষিণ প্রান্তে অধ্যাপক ডা. আব্দুল মান্নানের সভাপতিত্বে এবং মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ সানির সঞ্চালনায় প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হককে স্মরণে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য দেন ধল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হাজী আব্দুল আল মামুন, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আব্দুল গফুর ও আব্দুল মান্নান, অ্যাডভোকেট আফতাব উদ্দিন আহমেদ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদ খানসহ অন্যরা।
বক্তারা বলেন, প্রয়াত শামসুল হক ছিলেন দেশপ্রেম, মানবিকতা ও সমাজসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মানুষের কল্যাণে তার অবদান আজও এলাকার মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। আলোচনা সভা শেষে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা হয়। পরে গাজিন্দা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মাহমুদুল হাসান দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন।
সেতু উদ্বোধনকে ঘিরে এলাকায় ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। দীর্ঘদিনের কষ্টের অবসান হওয়ায় স্থানীয়দের আনন্দ ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, এটি শুধু একটি সেতু নয়, বরং তাদের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ধল্লা ইউনিয়নের চরউলাইল, ভাটিরচর, খাসেরচর, গেলেপাড়া, ফোর্ডনগর মোল্লাপাড়া, ফকিরপাড়া, বরদাইল, লাঙ্গুলিয়া, ধল্লা লক্ষীপুরসহ আশপাশের অন্তত ১০ গ্রামের মানুষ এতদিন ধল্লা বাজার খেয়াঘাটের ছোট নৌকার ওপর নির্ভর করে ঝুঁকি নিয়ে নদী পারাপার করতেন। বাজার, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, থানা কিংবা উপজেলা সদরে যেতে তাঁদের দীর্ঘ সময় নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। জরুরি পরিস্থিতিতেও দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো ছিল অত্যন্ত কঠিন।
এলাকাবাসীর দাবি, স্বাধীনতার পর ধলেশ্বরী নদীর এই অংশে সরকারি উদ্যোগে কোনো সেতু নির্মিত হয়নি। ফলে দীর্ঘদিনের সেই অবহেলার মধ্যেই একটি সামাজিক উদ্যোগ মানুষের যাতায়াতে নতুন স্বস্তি এনে দিয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এবং কয়েক হাজার মানুষের যাতায়াত সহজ করতে প্রায় ২৪০ ফুট দীর্ঘ ও ৭ ফুট প্রশস্ত এই বাঁশ ও কাঠের সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে পাঁচ লাখ টাকারও বেশি।
ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক অতিরিক্ত কর কমিশনার মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ সানি বলেন, ‘আমার বাবার স্মৃতিকে মানুষের কল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখতেই ২০১৯ সালে ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু হয়। ২০২২ সালে উপজেলা-ব্যাপী মেধাবৃত্তি কর্মসূচি চালু করি। এরপর থেকে শিক্ষা, মানবসেবা ও জনকল্যাণমূলক নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে আসছি। এই সেতু নির্মাণও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। ভবিষ্যতেও মানুষের কল্যাণে আরও বড় পরিসরে কাজ করতে চাই। সবার কাছে আমার বাবা ও পরিবারের জন্য দোয়া চাই।’