সম্পর্কের চূড়ায় যেতে চায় বাংলাদেশ-চীন

বাংলাদেশ ও চীন দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ককে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিতে চায়। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাদের বর্তমান ‘ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বকে’ আরও উন্নত করে একটি ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎসম্পন্ন বাংলাদেশ-চীন সমাজ’ যৌথভাবে গড়ে তুলতে সম্মত হয়েছেন দুই দেশের নেতারা। তারা মনে করছেন, এমন ব্যবস্থা দুই দেশ ও জনগণের জন্য বেশি সুবিধা বয়ে আনবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর শেষে গত শুক্রবার প্রকাশিত এক যৌথ ঘোষণায় এ সম্মতির কথা জানানো হয়েছে। 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেইজিংয়ে গত ২৫ জুন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক এবং ২৬ জুন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সফর শেষে দুই দেশের রাজধানী থেকে একযোগে  ১৫ দফা যৌথ ঘোষণাটি প্রকাশ করা হয়।

এতে বলা হয়, দুই দেশ সম্পর্ক, অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়াবলি নিয়ে গভীর মতবিনিময় করেছে এবং একটি ব্যাপক ঐকমত্যে পৌঁছেছে। বাংলাদেশে গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্যে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি বাস্তবায়নের প্রতি চীন সমর্থন জানিয়েছে। 

দুই দেশ উচ্চপর্যায়ের আলোচনার গতি বজায় রাখতে, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান বাড়াতে এবং সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে। এর অংশ হিসেবে উভয় পক্ষ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে কৌশলগত সংলাপের জন্য একটি ব্যবস্থা স্থাপন করতে সম্মত হয়েছে। দুই দেশ কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘২+২’ সংলাপের কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে একযোগে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী অথবা তাদের প্রতিনিধিরা একসঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।   

দুই দেশ নিজ নিজ মূল স্বার্থ ও প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলোতে একে-অপরের প্রতি তাদের দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। এর অংশ হিসেবে  বাংলাদেশ এক-চীন নীতির দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং স্বীকার করেছে যে, বিশ্বে চীন একটাই তাইওয়ান গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ভূখণ্ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ তাইওয়ানের স্বাধীনতার তীব্র বিরোধিতা করে। চীন বাংলাদেশের প্রতি সুপ্রতিবেশীসুলভ নীতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষায় দৃঢ়ভাবে সমর্থন জানিয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের জাতীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি স্বাধীন উন্নয়ন পথ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে সম্মান করেছে।

উভয় পক্ষ চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের’ অধীনে আধুনিকীকরণের লক্ষ্য অর্জনে উচ্চমানের সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে সম্মত হয়েছে। চীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দৃঢ়তা অর্জন, সামাজিক উন্নয়ন,  শিল্পায়ন ও কৃষি আধুনিকীকরণে তার সামর্থ্যরে সর্বোচ্চটুকু দিয়ে সমর্থন অব্যাহত রাখবে।

বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে এবং যৌথভাবে বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থা সমুন্নত রাখতে বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প ও সরবরাহ-শৃঙ্খল এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীন সহযোগিতা জোরদার করবে।

বাংলাদেশে চীনা সংস্থাগুলোর বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা হবে। উভয় পক্ষ যৌথভাবে মোংলা বন্দর পরিকাঠামো আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের উন্নয়নকাজ এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে।

বাংলাদেশে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) চীন তার সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা ও সাহায্য প্রদান করবে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে উভয় দেশের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা করবে। উভয় পক্ষ সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পানিসম্পদ পরিকল্পনা, প্রবহমান পানি ব্যবস্থাপনা, বন্যা প্রতিরোধ নদী খনন ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ে একমত হয়েছে। তারা সামুদ্রিক বিষয়ে সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে।

চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সরাসরি সংযোগসহ আঞ্চলিক সংযোগের জন্য নতুন নতুন বিকল্প অন্বেষণ করতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। উভয় পক্ষ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করতে সম্মত হয়েছে।

 প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কর্তৃক উপস্থাপিত মানবজাতির জন্য একটি অভিন্ন ভবিষ্যৎ সমাজ গঠনের রূপকল্প এবং ধারাবাহিক বৈশ্বিক উদ্যোগসমূহের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বাংলাদেশ এ বিষয়ে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা চালিয়ে যেতে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য একটি পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করতে চীন তার সাধ্যমতো পাশে থাকবে।

ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার অংশীদার হওয়ার জন্য বাংলাদেশের আবেদনকে চীন সমর্থন দেওয়ার কথা জানায়। উভয় পক্ষ জাতিসংঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা সমর্থিত আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা, একটি সমতাভিত্তিক ও সুশৃঙ্খল বহুমেরু বিশ্ব এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে। উভয় পক্ষ ফ্যাসিবাদী ও সামরিকতাবাদী পুনরুজ্জীবনের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা অপরিহার্য বলে মনে করে।

উভয় পক্ষ উন্নয়ন ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং গণমাধ্যম সহযোগিতাসহ বিভিন্ন খাতে মোট ১৭টি সহযোগিতা দলিলে স্বাক্ষর করেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল শনিবার ঢাকায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ১৭টি সহযোগিতা দলিলে দুই দেশের সই করার বিষয়টি জানায়।

মিয়ানমারের হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করিডর স্থাপনের জন্য চীনের প্রস্তাবের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, চীনের এ প্রস্তাবটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। এখনো চূড়ান্ত অবস্থান নেওয়া হয়নি। করিডর নিয়ে সরকারের আগ্রহের প্রধান কারণ হিসেবে তিনি পরিবহন খরচ কমানোর বিষয়টি উল্লেখ করেন। 

এ সফর থেকে বাংলাদেশ ‘নগদ কী পেল’ এমন এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা ভিক্ষার থলি নিয়ে যাই নাই। দুই দেশের সম্পর্কে অভিমুখ ঠিক করতে এ সফর। এটা ঠিক হলে বাকিগুলো ভবিষ্যতে আসবে।’ এ ধরনের বিব্রতকর প্রশ্ন না করার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে অনুরোধ জানান।  

তিস্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, খুব দ্রুতই এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হবে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান গত ২১ জুন বিদেশে প্রথম সরকারি সফরে মালয়েশিয়া যান। সেখান থেকে গত ২২ জুন তিনি চীনে সরকারি সফরে যান।

সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ : মালয়েশিয়া ও চীনে সফল সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে গতকাল শনিবার জাতীয় সংসদে একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

এ বিষয়ে সংসদে তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে তাদের স্বার্থ দেখার। মালয়েশিয়া ও চীন সফরে আমি দেশের ও দেশের মানুষের স্বার্থ নিয়ে কথা বলেছি এবং সেই স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছি।’ তিনি বলেন, ‘এখানে আমাদের ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নেই। এ সফরে যদি ভালো কিছু অর্জিত হয়ে থাকে, তবে সেটি বাংলাদেশের অর্জন। এটি দেশের মানুষের অর্জন।’

সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ধন্যবাদ প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে দেশ দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির ওপর ভিত্তি করেই সফরটি সম্পন্ন হয়েছে। এ সফরের মাধ্যমে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের মানদণ্ড নিশ্চিত করা হয়েছে।

বিরোধী দলের সমর্থনের আশ্বাস : ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সংসদকে পাশ কাটিয়ে কিছু না করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিদেশের সঙ্গে সম্পাদিত সব মৌলিক চুক্তি সংসদে উপস্থাপন করলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

বিরোধীদলীয় নেতা দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার আহ্বান জানান। এ বিষয়ে বিরোধী দল হিসেবে সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে, এমন আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সত্যিকার অর্থেই একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি দেখতে চাই এবং তা বাস্তবায়ন করতে চাই।’