ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলা প্রশ্নবিদ্ধ যুদ্ধবিরতি

আপডেট : ২৮ জুন ২০২৬, ০৪:২৭ এএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ অবসানে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করার পর অঞ্চলটিতে উত্তেজনা কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছিল। তবে হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে হামলা এবং এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ সে আশাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। ইরানে হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনায় আঘাত হানার কথা জানিয়েছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। গতকাল শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বার্তায় আইআরজিসি সতর্ক করে বলেছে, আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি হলে তাদের প্রতিক্রিয়া আরও ব্যাপক হবে। তবে কোনো কোনো স্থাপনায় হামলা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। বাহরাইন দাবি করেছে, তাদের ভূখণ্ডে একটি ইরানি ড্রোন হামলা হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ঘটনাকে সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে। একটি তেলবাহী জাহাজেও অজ্ঞাত সূত্রের একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। তবে জাহাজটির সব নাবিক নিরাপদ রয়েছেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও)।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরান হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে তারা ইরানের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তারা গত শুক্রবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার অবস্থানে আঘাত হেনেছে। এর আগের দিন একটি কার্গো জাহাজে ড্রোন হামলার জবাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় ওই অঞ্চলে আটকে পড়া হাজারো নাবিককে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত হয়ে গেছে। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজিও এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ক্ষোভ জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রমাণ করেছেন যে, তিনি আলোচনার নীতি কিংবা যুদ্ধবিরতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে ‘যুদ্ধবিরতির বেপরোয়া লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেন আজিজি। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ইরান একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। আমরা সেই চুক্তি মেনে চলেছি। সমঝোতা স্মারক কীভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তা নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি থাকলে, তারা কথা বলতে পারে। তিনি আরও বলেন, সহিংসতার জবাব সহিংসতার মাধ্যমেই দেওয়া হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলা দুই দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। থিংক ট্যাংক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, সাম্প্রতিক হামলাগুলো সমঝোতা স্মারককে প্রবল চাপে ফেলেছে। অন্যদিকে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব রোমের গবেষক আন্দ্রেয়া দেসি মনে করেন, সাম্প্রতিক উত্তেজনা প্রমাণ করছে যে, সমঝোতাটি অত্যন্ত নাজুক এবং যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। তার মতে, পূর্ণমাত্রার সংঘাতে জড়ানো দুই পক্ষের কারও স্বার্থেই নয়। তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রয়েছে এটি দেখাতে গিয়ে পরিস্থিতি যেকোনো সময় আরও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর প্রতিক্রিয়ায় উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে থাকা ওয়াশিংটনের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা হামলা চালায়। বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। এরপর হামলা ও পাল্টা হামলার মধ্যে মধ্যে পাকিস্তান এবং কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বিরতিতে দুই দেশ সম্মত হলেও, হরমুজ প্রণালি অচল ছিল। সর্বশেষ ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি সমঝোতা হওয়ার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আবার শুরু হয়। এর মধ্যে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনাও শুরু করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা। এর মধ্যেই নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটল। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এ অঞ্চলে নতুন সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে আবারও অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত