বিশ্বকাপ ফুটবল

রূপকথার নায়কদের দিকে এবার আর্জেন্টিনার চোখ

আপডেট : ২৮ জুন ২০২৬, ০৪:২৯ এএম

বাংলাদেশ সময় আজ সকাল ৮টায় জর্ডানের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচ দিয়ে শেষ হচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের খেলা। তবে এ ম্যাচ নিয়ে ফুটবলবিশ্বে যতটা না আলোচনা, তার চেয়ে ঢের বেশি গুঞ্জন শুরু হয়েছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার রাউন্ড অব ৩২-এর প্রতিপক্ষকে নিয়ে। গ্রুপপর্বের সমীকরণ মিলিয়ে নকআউটের টিকিট কেটে ফুটবল দুনিয়াকে স্তব্ধ করে দিয়েছে আটলান্টিক মহাসাগরের মাত্র সাড়ে ৫ লাখ জনসংখ্যার এক ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। আগামী ৩ জুলাই মায়ামিতে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন টুর্নামেন্টের এ নবাগত ‘জায়ান্ট কিলাররা’।

ফিফা যখন বিশ্বকাপের দল সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন ফুটবলবোদ্ধাদের অনেকেই সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু গতকাল হিউস্টন স্টেডিয়ামে সৌদি আরবের সঙ্গে ০-০ গোলে ড্র করার পর কেপ ভার্দের খেলোয়াড়দের যে দৃশ্য দেখা গেল, ঠিক এমন কিছুরই স্বপ্ন দেখেছিল ফিফা। ম্যাচশেষ হতেই মাঠের মধ্যে একটি মাত্র মোবাইল ফোনকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কেপ ভার্দের ফুটবলাররা। সেখানে তারা দেখছিলেন অন্য ম্যাচের লাইভ আপডেট, যেখানে স্পেন ১-০ গোলে হারিয়ে দেয় উরুগুয়েকে। আর স্পেনের এ জয়েই গ্রুপ ‘এইচ’ থেকে রানার্স-আপ হিসেবে নিশ্চিত হয় কেপ ভার্দের ঐতিহাসিক নকআউটের টিকিট। মুহূর্তেই কান্না আর বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম।

এ যেন কোনো সিনেমার গল্প! গ্রুপপর্বে একটি ম্যাচও হারেনি কেপ ভার্দে। প্রথম ম্যাচেই ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রতে আটকে দিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল তারা। এরপর দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র এবং শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের সঙ্গে পয়েন্ট ভাগাভাগি করে ৩ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের দ্বিতীয় স্থান নিশ্চিত করেন ব্লু শার্কসরা।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে নকআউট পর্বে পৌঁছানো সবচেয়ে ছোট দেশ এখন কেপ ভার্দে। এ অবিস্মরণীয় সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাদের ফুটবল ফেডারেশনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ২৫ জনের স্কোয়াডের ১৪ খেলোয়াড়ই জন্মেছেন দেশের বাইরে, যাদের মূলত পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলোর প্রবাসী ডায়াসপোরা থেকে খুঁজে বের করা হয়েছে। ডিফেন্ডার রবার্তো লোপেস বলেন, ‘আমাদের মনে একটা আত্মবিশ্বাস সবসময় ছিল যে, আমরা বিশ্বের সেরা দলগুলোর সঙ্গে লড়াই করতে পারি। এটা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি, দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফসল।’

দলের এ রূপকথার পেছনের মূল কারিগর ২০২০ সাল থেকে দায়িত্বে থাকা কোচ বুবিস্তা। ২০১৫ সালের ‘ক্যাফ বর্ষসেরা কোচ’ হওয়া এ সাবেক ডিফেন্ডার ম্যাচশেষে নিজের দেশের পতাকা জড়িয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে বলেন, ‘কাজ মানুষকে মর্যাদা দেয়। এটা কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; বরং কঠোর পরিশ্রম আর শৃঙ্খলার ফল। আমরা ছোট দেশ হতে পারি, কিন্তু আমরা ভীতিহীন ফুটবল খেলি। আমাদের জন্য কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।’

পরবর্তী রাউন্ডে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়া প্রসঙ্গে মিডফিল্ডার ডেরয় দুয়ার্তে উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারেননি। ম্যাচসেরার পুরস্কার হাতে নিয়ে তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে মনে হচ্ছে আমি কোনো স্বপ্নে আছি। ছোটবেলা থেকে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখতাম, আর আজ আমরা ইতিহাস গড়লাম। সামনে আর্জেন্টিনা, ম্যাচটি ভীষণ কঠিন হবে। তবে বিশ্বাস রাখতে হবে ফুটবল মাঠে যেকোনো কিছু হওয়া সম্ভব।’

কেপ ভার্দে দলটির মূল দর্শন লুকিয়ে আছে একটি শব্দে ‘মোরাবেজা’, যার অর্থ হলো কোনো চাপ ছাড়া বাঁচা। আর এ মন্ত্র নিয়েই বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সামনে দাঁড়াতে যাচ্ছে টুর্নামেন্টের এই ‘সিন্ডারেলা’। দলটির প্রধান তারকা ও বাছাই পর্বের গোলদাতা ডাইলোন লিভরামেন্টো তো যুক্তরাষ্ট্র পাড়ি দেওয়ার আগেই স্পষ্ট করে বলেছিলেন তারা এখানে এসেছেন কেবল ‘আনন্দ করতে’।

তবে এ আনন্দ করতে আসা দলটিকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই লিওনেল স্কালোনির শিষ্যদের। ফিফা র‌্যাংকিংয়ে ৬৪ নম্বরে থাকা এ দলটির মুখোমুখি হওয়ার আগে আর্জেন্টিনা দলের জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা হতে পারে। গ্রুপপর্বে একটি ম্যাচও হারেনি কেপ ভার্দে। প্রথম ম্যাচেই ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রতে আটকে দেয় তারা। এরপর দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র এবং শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের সঙ্গে পয়েন্ট ভাগাভাগি করে রানার্স-আপ হিসেবে পরের রাউন্ড নিশ্চিত করে ব্লু শার্কসরা।

মায়ামিতে আর্জেন্টিনার সামনে কেপ ভার্দে মূলত তাদের ‘স্পেন-বধের’ ছকটিই নতুন করে সাজাবে। আটলান্টায় স্পেনের বিপক্ষে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে যেভাবে চারজন ডিফেন্ডার এবং পাঁচজন মিডফিল্ডারের এক দুর্ভেদ্য দেওয়াল তুলেছিল তারা, আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও ঠিক একই রূপ দেখা যেতে পারে। স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচের একটি বড় সময় কেপ ভার্দের রক্ষণভাগ চারজনের থেকে মূলত ছয়জনের লাইনে রূপ নিয়েছিল। ফলে স্পেনকে তারা লুই এনরিকের সেই চেনা ‘হাজার পাসের চোরাবালিতে’ আটকে মারতে সক্ষম হয়। স্টিভেন মোরেরা, রবার্তো লোপেস, ডিনে বোর্হেস এবং সিডনি ক্যাবরালের গড়া সেই ডিফেন্সিভ লাইন ছিল জমাট ও নিখুঁত, যার সামনে স্প্যানিশ উইঙ্গাররা এক চুল জায়গা পায়নি। ৩৯ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহার দুর্দান্ত ফর্ম স্কালোনির আক্রমণভাগের জন্য অন্যতম বড় বাধা হতে যাচ্ছে।

তবে কেপ ভার্দে কেবল রক্ষণাত্মকই খেলে না, পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের রূপ বদলাতেও ওস্তাদ। উরুগুয়ের বিপক্ষে মায়ামির ম্যাচেই তার প্রমাণ মিলেছিল। সেখানে তারা রক্ষণাত্মক খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে মার্সেলো বিয়েলসার উরুগুয়ের সঙ্গে সমানতালে লড়েছে। মিডফিল্ডার কেভিন পিনার ফ্রি-কিক এবং দ্বিতীয়ার্ধে ফার্নান্দো মুসলেরা ও অলিভেরার ভুলের সুযোগ নিয়ে হেলিও ভ্যারেলা গোল করে ম্যাচটি ২-২ ব্যবধানে ড্র করেন। অবশ্য উরুগুয়ের মতো বড় দলের বিপক্ষে আক্রমণাত্মক খেলতে গিয়ে তারা কিছু ব্যক্তিগত ভুল এবং রক্ষণভাগে আলগা জায়গাও তৈরি করেছিল, যা আর্জেন্টিনার ইনফর্ম ফরোয়ার্ড লাইনের জন্য গোল বের করার চাবিকাঠি হতে পারে।

আর্জেন্টিনাকে মায়ামির ম্যাচে মূলত দুটি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি মনোযোগী হতে হবে : ধৈর্যের পরীক্ষা: কেপ ভার্দে পুরো ম্যাচজুড়েই নিজেদের অর্ধ বা ডি-বক্সের সামনে বাস পার্ক করে রাখতে চাইবে। স্পেন মাঝমাঠে বলের পজিশন ধরে রাখলেও বক্সে যেভাবে ফাইনাল পাস দিতে ব্যর্থ হয়েছিল, আর্জেন্টিনাকে সেই ভুল করা চলবে না। মেসির জাদুকরী পাসিং এবং মাঝমাঠের খেলোয়াড়দের দ্রুত পজিশন অদলবদল করে ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিতে হবে।

কাউন্টার অ্যাটাক ও পাসিং ভুল এড়ানো : কেপ ভার্দে ম্যাচের প্রায় ৯০ শতাংশ সময়ই বল আর্জেন্টিনার পায়ে ছেড়ে দেবে। কিন্তু বল পজিশন ধরে রাখার সময় আর্জেন্টিনার ডিফেন্স ও মাঝমাঠকে একদম নিরাপদ পাস খেলতে হবে। কারণ ডাইলোন লিভরামেন্টো ও ভ্যারেলাদের মতো গতিময় ফরোয়ার্ডরা আর্জেন্টিনার যেকোনো ছোট পাসিং ভুলের অপেক্ষায় থাকবে, যেন দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে গিয়ে মরণ কামড় দেওয়া যায়।

কেপ ভার্দে আফ্রিকা অঞ্চলের দল। আফ্রিকানদের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স বেশ ভালো। ২৭ ম্যাচ খেলেছে, যার মধ্যে ২০টিতেই তারা জিতেছে। বাকি ম্যাচগুলোর মধ্যে ৩টি ড্র হয়েছে, মাত্র ৪টি ম্যাচে আলবিসেলেস্তেরা হেরেছে। এ হারগুলোর মধ্যে নাইজেরিয়ার কাছে দুবার, ২০১৭ সালের প্রীতি ম্যাচে ৪-২ গোলে এবং তার আগে ২০১১ সালে আরেক প্রীতি ম্যাচে ৪-১ গোলে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। তবে সবচেয়ে বড় পরাজয় ছিল ১৯৯০ ইতালি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ক্যামেরুনের সঙ্গে খেলতে নেমেই ১-০ গোলে হেরে যায় ডিয়েগো ম্যারাডোনার দল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত