স্পুল ফিতা থেকে হার্ডডিস্ক

তিন যুগের সাক্ষী শব্দ প্রকৌশলী বাদশা

বাংলাদেশের অডিও শিল্পের সোনালি যুগ মানেই ক্যাসেটের ফিতা। অডিও শিল্পকে শব্দধারণ, মিক্সিং এবং মাস্টারিংয়ে সমৃদ্ধ করেছেন যে কজন ব্যক্তি তাদের অন্যতম একজন হলেন মিজানুর রহমান বাদশা। নব্বই দশকে স্টুডিওর ভেতরে গীতিকার, সুরকার, যন্ত্রশিল্পী এবং কণ্ঠশিল্পীদের তুমুল ব্যস্ততা আর মিক্সিং কনসোলের পেছনে দিন-রাত এক করা বাদশার শ্রম ও মেধা শ্রোতাদের উপহার দিয়েছে হাজার হাজার গান। বর্তমান ডিজিটাল যুগের শ্রোতারা যখন স্পটিফাই বা ইউটিউবে নব্বই কিংবা এই শতাব্দীর শুরুর দশকের কোনো কালজয়ী গান শোনেন, তখন হয়তো অনেকেই জানেন না সেই গানের নিখুঁত শব্দের পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো শব্দ প্রকৌশলীর রাতজাগা শ্রম আর গভীর মনোযোগ। এমনই এক ঐতিহাসিক ও গৌরবময় অধ্যায়ের সাক্ষী বেইলি রোডের তৎকালীন বিখ্যাত ‘অডিও আর্ট স্টুডিও’র প্রধান শব্দ প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বাদশা। বাংলাদেশের অডিও রেকর্ডিংয়ের বিবর্তনে যে তিনটি যুগ এসেছে এনালগ স্পুল ফিতা, ডিজিটাল হাই-এইট এবং বর্তমানের সম্পূর্ণ ডিজিটাল হার্ডডিস্ক রেকর্ডিং; তিনি দেশের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব যিনি এই তিনটি মাধ্যমেই সমান দক্ষতায় কাজ করেছেন এবং আজও সফলতার সঙ্গে করে যাচ্ছেন।

বেইলি রোডের ‘অডিও আর্ট স্টুডিও’ ছিল তৎকালীন দেশের শীর্ষ সংগীত পরিচালক ও লিজেন্ডারি শিল্পীদের প্রধান আস্তানা। সেখানে সুরসম্রাট আলাউদ্দিন আলী কিংবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মতো কিংবদন্তিরা নিয়মিত কাজ করতেন। মিজানুর রহমান বাদশাকে তারা এতটাই স্নেহ করতেন যে, বুলবুল সাহেব তাকে নিজের পাশে বসিয়ে খাওয়াতেন। আবার বাদশার ওপর সুরকার আলাউদ্দিন আলীরও ছিল অগাধ আস্থা। রেকর্ডিং বা মিক্সিংয়ের মূল সময়ে প্রায়ই তিনি স্টুডিওর ভেতরে থাকতেন না। জিজ্ঞেস করলে পরম নির্ভরতায় বাদশাকে বলতেন, তুমি আছো না? আমার আর ভেতরে থাকার দরকার কী!’ সংগীতের এই মহীরুহদের এমন অকুণ্ঠ বিশ্বাসই ছিল শব্দ প্রকৌশলী বাদশার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি। বাদশার কাজের সুখ্যাতি শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছড়িয়ে পড়েছিল সীমানা পেরিয়ে কলকাতাতেও।

দেশের অন্যতম শব্দ প্রকৌশলী বাগেরহাটের কৃতী সন্তান মিজানুর রহমান বাদশার কাজের ক্যানভাসটা কত বড়, তা সুরকার আর শিল্পীদের তালিকার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। আলাউদ্দিন আলী, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, আজাদ মিন্টু, সোহেল নিজামী, মিল্টন খন্দকারদের মতো প্রখ্যাত মিউজিক ডিরেক্টরদের সঙ্গে তিনি যেমন কাজ করেছেন, তেমনি তার মিক্সিং কনসোলের সামনে দাঁড়িয়েছেন দুই প্রজন্মের সব মেগা স্টাররা।