ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে সময়, আগামী শুক্রবারই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির দ্বিবার্ষিক নির্বাচন। আর এই নির্বাচনকে ঘিরে বদলে গেছে এফডিসির চেহারা। নির্বাচনে হেভিওয়েট প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলেও সাধারণ শিল্পীদের পদচারণায় মুখর বিএফডিসির প্রতিটি চত্বর। সময় যত এগিয়ে আসছে, ততই যেন সরগরম হয়ে উঠছে চিত্রপুরী। আনাগোনা বাড়ছে সাধারণ ভোটারদের। শুটিং, ডাবিংয়ের অভাবে যে এফডিসিতে দীর্ঘদিন বিরাজ করছে হাহাকার, সেই এফডিসি এখন জমে উঠেছে সিনিয়র-জুনিয়রদের আনাগোনায়। অনেক পুরনো মুখও হাজির হচ্ছেন প্রতিদিনের আড্ডা-আয়োজনে। আলীরাজ, নূতন, রোজিনাদের পাশাপাশি দেখা মিলছে নাসরিন, জ্যাকি আলমগীর, হারুণ কিসিঞ্জার, ইলিয়াস কোবরাদেরও। প্রার্থীদের উপস্থিতি ছাড়াও নাচ-গান এবং হই-হুল্লোড়ে মাঝে-মধ্যেই শামিল হচ্ছেন সমিতির বর্তমান সভাপতি মিশা সওদাগর, চিত্রনায়ক বাপ্পারাজ ও ওমর সানী। সেই সঙ্গে সংবাদকর্মী ও ইউটিউবারদের ভিড়। যেকোনো শিল্পীকে দেখা মাত্রই তারা ঝাঁপিয়ে পড়ছেন তাদের সাক্ষাৎকার ও মন্তব্য নিতে। এরই মধ্যে বিভিন্ন শিল্পীর বক্তব্য নিয়েও চলছে জোর চর্চা। থেমে নেই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও। এই যেমন চিত্রনায়ক ওমর সানীর একটি বক্তব্য নিয়ে বেশ কাদা ছোড়াছুড়ি ও উত্তেজনাকর একটি পরিবেশ তৈরি হয় শিল্পীদের মধ্যে। কোনো এক চ্যানেলে ওমর সানী বলেছিলেন, ‘এবারের শিল্পী সমিতির নির্বাচনে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তারা সবাই কুলাঙ্গার।’ তার এই বক্তব্য যখন ভাইরাল হয়ে যায় এবং সহশিল্পীরা তাকে নিয়ে নেতিবাচক কথাবার্তা বলতে থাকেন, তখনই ভুল ভেঙে দিতে এফডিসিতে আসেন ওমর সানী। বলেন, ‘আমি ঢালাওভাবে সবাই কুলাঙ্গার বলিনি, দুয়েকজনের কথা উল্লেখ করেছি।’
এদিকে নির্বাচনের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী জয় চৌধুরীর হুন্ডি কেলেঙ্কারির ফাঁস হওয়া অডিও, ‘মুজিব কোট’ বিতর্ক, আর জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-আন্দোলনের বিরোধিতা সব মিলিয়ে নির্বাচনী মাঠ হয়ে ওঠে উত্তপ্ত। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে জয় নাকি গত শনিবার মাল্টিমিডিয়ার কয়েকজন সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন। যার দরুন গতকাল রবিবার বিকেল ৩টায় বিএফডিসি প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করেন মাল্টিমিডিয়া বিনোদন সাংবাদিকরা। এছাড়া আরও কয়েকজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোরও অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, সদস্যপদ নিয়েও বড় ধরনের এক অভিযোগ উঠে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগকে তুচ্ছ করে সবাই মেতেছেন ভোটের আনন্দে। সবারই প্রত্যাশা, একটি সুন্দর, সুষ্ঠু ও পরিচ্ছন্ন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মূলধারার চলচ্চিত্রশিল্পের প্রাণ ফিরিয়ে আনতে এই নির্বাচন কতটা ফলপ্রসূ হবে? দিনের পর দিন বেকার থাকা শিল্পীদের কতটুকু প্রাণচঞ্চল করবে এবং তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকরী ভূমিকা রাখবে? সঠিক ও দূরদর্শী নেতৃত্ব বাংলা সিনেমার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে এবং শিল্পীদের পেশাগত মানোন্নয়নে কতখানি অগ্রসর হবে? যদিও এমন প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো জবাব দিতে পারেননি, দুই প্যানেলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীরা।
এত হিসাব-নিকাশকে পাশ কাটিয়ে ভোট চাওয়ায় প্রচার-প্রচারণা আর সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের মাধ্যমে ভোট চাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন প্রার্থীরা। তবে এবার প্রচারণায় কঠোরতা মেনে দেয়াল পোস্টারের বদলে প্যানেলভিত্তিক সীমিত ব্যানার ও হ্যান্ডবিল ব্যবহার করা হচ্ছে। শিল্পী সমিতির কার্যালয়ের দুই পাশে প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলগুলোর ক্যাম্প বসেছে, প্রার্থীরা ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে মূলত দুটি প্যানেল। একটি প্যানেলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন শিবা শানু ও জয় চৌধুরী। অন্যদিকে আরমান ও রুমানা ইসলাম মুক্তি গড়েছেন আরেকটি প্যানেল। এ ছাড়া ১০ জনের বেশি শিল্পী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নিজেদের নাম ঘোষণা করেছেন। শিল্পী সমিতির মোট সদস্য সংখ্যা ৬১০ হলেও ভোটার তালিকায় রয়েছেন ৫৭৩ জন সদস্য। ৩ জুলাই সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে।
কে কোন পদে লড়ছেন
আরমান-মুক্তি পরিষদে সহ-সভাপতি পদে লড়ছেন চিত্রনায়িকা নূতন ও খলনায়ক ইলিয়াস কোবরা। সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে রিনা খান, সাংগঠনিক সম্পাদক পদে চুন্নু, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে এম এ পারভেজ চৌধুরী আবীর, দপ্তর ও প্রচার সম্পাদক পদে রাসেল মিয়া, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া সম্পাদক পদে মারুফ আকিব এবং কোষাধ্যক্ষ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন খল অভিনেতা কামরুজ্জামান কমল । এ প্যানেলের কার্যনির্বাহী সদস্য প্রার্থীরা হলেন মানস বন্দ্যোপাধ্যায়, দুলারী, রাকা, শারমিন আক্তার, লতিফ (চিতা), নাসরিন, সুশান্ত, শাহীন কমেডি, বাদল শেখ, আরমান খান ও শামীম খান (চিকন আলী)।
শিবা সানু-জয় চৌধুরী পরিষদের সদস্যরা হলেন সহ-সভাপতি ডি এ তায়েব ও রোজিনা। সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে সুব্রত, সাংগঠনিক সম্পাদক পদে সনি রহমান, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে পলি, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে মুশফিকুর রহমান কাকন, দপ্তর ও প্রচার সম্পাদক পদে জ্যাকি আলমগীর এবং কোষাধ্যক্ষ পদে লড়ছেন জাদু আজাদ। এ প্যানেলের কার্যকরী পরিষদ সদস্য প্রার্থীরা হলেন- আলীরাজ, ফরহাদ, শিপন মিত্র, ফিরোজ শাহী, ইয়ামীন হক ববি, হাসান জাহাঙ্গীর, শিরিন শিলা, ফাল্গুনী রহমান জলি, কায়েশ আরজু ও কাবিলা।
নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন খোরশেদ আলম খসরু ও বি এইচ নিশান কামাল কিবরিয়া লিপু।