বিয়েতে বর-কনের সমতা কতটা জরুরি

সমাজের মূল ভিত্তি পরিবার। পরিবার গঠিত হয় বিয়ের মাধ্যমে। বিয়ে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। বর্তমান দম্পতিদের দিকে তাকালে দেখা যায়, কোনো কোনো দাম্পত্য শান্তিময়, আবার কোনো দাম্পত্যে একে অপরের মধ্যে অভিযোগ, আপত্তি ও অশান্তিতে পরিপূর্ণ। এই দুরবস্থার অন্যতম কারণ হলো বিয়ের আগে কুফুর (সমতা) দিকে মনোযোগী না হওয়া। কুফু বজায় রেখে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হলে বৈবাহিক জীবন হয় সহজ, সুন্দর ও টেকসই।

কুফু শব্দের অর্থ সামঞ্জস্য, মিল ও সমতা। বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর-কনের মধ্যে বংশীয় পরিচয়, ধর্মীয় জীবন, সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা ও আর্থিক দিক থেকে সামঞ্জস্য থাকাকে কুফু বলে। তবে ইসলামে দ্বীনদারিতা ও চারিত্রিক কুফুকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা ভবিষ্যৎ বংশধরদের স্বার্থে উত্তম নারী নির্বাচন করো এবং কুফু বিবেচনায় বিয়ে করো। আর বিয়ে দিতেও সমতার প্রতি লক্ষ রাখো।

বিয়ের ক্ষেত্রে একপক্ষ যদি ধার্মিক হয়, তাহলে সে চাইবে প্রতিটি ক্ষেত্রে ধর্মের ছাপ থাকতে। অন্যদিকে অপর পক্ষ যদি ধর্ম চর্চা থেকে দূরে থাকে, তবে সে ধর্মীয় সীমারেখা মানতে অনাগ্রহী হতে পারে। এর ফলে দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ, মানসিক দূরত্ব ও অশান্তিতে পরিপূর্ণ হবে। তাই ধর্মীয় জীবনে সামঞ্জস্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম মালেক দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, কুফুর বিষয়টি কেবলমাত্র দ্বীনদারিতার ক্ষেত্রেই বেশি বিবেচ্য। চারিত্রিক কুফুর গুরুত্ব বোঝাতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘দুশ্চরিত্র নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য এবং দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্র নারীর জন্য, সচ্চরিত্র নারী সচ্চরিত্র পুরুষের জন্য এবং সচ্চরিত্র পুরুষ সচ্চরিত্র নারীর জন্য উপযুক্ত।’ (সুরা নুর/২৬)

অতএব বর-কনের ধর্মচর্চা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে সমতা গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি বংশমর্যাদা ও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রেও সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। কেননা এতে বিস্তর পার্থক্য থাকলে দাম্পত্য জীবনে ভুল বুঝাবুঝি ও মতবিরোধ হয়ে থাকে। ফলে বৈবাহিক জীবন হয় তিক্ত ও বিষাক্ত। সমমর্যাদার মানুষকে বিয়ে করলে বোঝাপড়া ভালো হয় এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় থাকে। ইমাম শাফেয়ি (রহ.) আর্থিক কুফুর গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। আর্থিক সমতা থাকলে একে অপরের খরচের ধরন মিল থাকে, যা স্বচ্ছন্দ ও মানসিক শান্তি বজায় রাখে।

যদি দুজন মানুষের আর্থিক বাস্তবতা ও অর্থব্যয়ের অভ্যাসে বড় ধরনের পার্থক্য থাকে, তবে বিয়ের পর নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। যেমন একজন হয়তো সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত এবং অল্পতেই সন্তুষ্ট। অন্যজন বিলাসী পরিবেশে বেড়ে উঠেছে এবং স্বাভাবিকভাবেই তার প্রত্যাশাও বেশি। তখন ছোট ছোট বিষয়ে খরচের ধরন, উপহার, বাসস্থান, জীবনযাত্রার মান কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে অপ্রকাশ্য চাপ ও মানসিক অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।

যখন অর্থনৈতিক বোঝাপড়া থাকে তখন সংসারে স্বচ্ছতা, স্বস্তি এবং মানসিক শান্তি বজায় রাখা সহজ হয়। কারণ সুখী দাম্পত্য বাস্তবতার সঙ্গে সুন্দর সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। বিয়ের ক্ষেত্রে ধর্মীয় কুফু ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে (যেমন বংশীয় পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা, আর্থিক অবস্থা ইত্যাদি) কুফু অপরিহার্য শর্ত নয়। কুফু বজায় রেখে সঙ্গী নির্বাচন করলে দাম্পত্য জীবন সুখী ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

লেখক : শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়