শান্তি প্রতিষ্ঠায় ন্যায়বিচার

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ০৭:৩২ এএম

পৃথিবীতে মানুষের নিরাপদ সহাবস্থান ও সামাজিক ভারসাম্যের প্রধান রক্ষাকবচ হলো ন্যায়বিচার। কোনো জনপদ যখন ন্যায়বিচার থেকে দূরে সরে যায়, তখন সেখানে বিশৃঙ্খলা ও নৈতিক অবক্ষয় মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। পারিবারিক লেনদেন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ, সবক্ষেত্রেই সততা ও হক আদায়ের নামই হলো ইনসাফ বা ন্যায়বিচার। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বারবার ইনসাফ কায়েমের নির্দেশ দিয়েছেন এবং জুলুমের পরিণাম সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। জুলুম বা অন্যায়ভাবে কারও অধিকার হরণ করা এমন এক অপরাধ, যা কেবল ব্যক্তির ক্ষতি করে না, বরং পুরো সমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেয়। ইসলামের সোনালি ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যখনই শাসকরা ইনসাফের নীতিতে অটল ছিলেন, তখনই তারা বিশ^জুড়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন। বিপরীতে দম্ভ ও ক্ষমতার অপব্যবহার যুগে যুগে শক্তিশালী সাম্রাজ্যকেও ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। বর্তমান সময়ের অস্থিরতা ও বৈষম্য দূর করতে হলে ইসলামের এই দর্শনের প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। ব্যক্তি যখন নিজের ভেতরে পরকালীন জবাবদিহির ভয় জাগ্রত করে অন্যের প্রতি উদার ও ন্যায়পরায়ণ হবে, তখনই একটি আদর্শ ও শান্তিময় সমাজ গঠন সম্ভব হবে, এটাই ইসলামের রূপরেখা।

ইনসাফ মানে কারও হক আদায় করে দেওয়া, জুলুম মানে সেই হক হরণ করে নেওয়া। কোনো দায়িত্বে অযোগ্য ব্যক্তিকে বসানো যেমন জুলুম, তেমনি প্রাপ্যকে বঞ্চিত করাও জুলুম। ইসলাম এই জুলুমকে কেবল ব্যক্তি নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও ধ্বংসাত্মক বিবেচনা করে। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘জুলুম কেয়ামতের দিন গাঢ় অন্ধকার রূপ ধারণ করবে।’ (সহিহ বুখারি) আজকের সমাজে যখন একের পর এক অন্যায়, দুর্নীতি ও নির্যাতনের খবর আমরা শুনি, তখন ইসলামের ইনসাফের দর্শনই হতে পারে মুক্তির পথ। ইসলাম কেবল বিচারককে নয়, প্রত্যেক ব্যক্তিকেই ইনসাফের প্রতি দায়বদ্ধ করেছে। স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, আমলা সবার জন্য ইনসাফ একটি ফরজ দায়িত্ব।

ইসলামি সভ্যতা ইনসাফের ভিত্তিতে নির্মিত হয়েছিল বলেই তা হয়ে উঠেছিল বিশ্বমানবতার আদর্শ। যখন মুসলিম শাসকরা ইনসাফে ছিলেন দৃঢ়, তখন তারা বিশে^র নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু যখন এই ইনসাফচেতনা থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে, তখনই মুসলিম উম্মাহ দুর্বল হয়েছে, সাম্রাজ্য বিলীন হয়েছে। তাই আজ প্রয়োজন নতুনভাবে ইনসাফকে জীবনের প্রতিটি স্তরে বাস্তবায়ন করা। ব্যক্তিজীবনে, পারিবারিক সম্পর্কে, অফিস-আদালতে ইনসাফের নীতি অনুসরণ করতে না পারলে সমাজে শান্তি আসবে না।

ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম শব্দের অর্থই শান্তি। ইসলামের মূল উদ্দেশ্যই হলো শান্তির সমাজ গড়ে তোলা। তবে শান্তি কেবল শব্দে নয়, শান্তি চাই বাস্তবতায়, যা অর্জিত হয় ন্যায়বিচারের মাধ্যমে। আর ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয় যখন জুলুমের কোনো প্রলেপ সমাজে না থাকে। ইসলামের প্রারম্ভ থেকে কোরআন-সুন্নাহের প্রতিটি স্তরে যে বাণী বারবার উচ্চারিত হয়েছে, তা হলো ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং জুলুম প্রতিরোধ। কারণ জুলুম মানেই শৃঙ্খলার অবসান, ন্যায়বিচারের ধ্বংস আর শান্তির কফিনে শেষ পেরেক। নবী-রাসুলগণ এসেছেন এই ইনসাফের দাওয়াত নিয়ে এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে সেই দাওয়াত বাস্তবায়নের সংগ্রামে তারা হয়েছেন অতুলনীয় সাহসী। কিন্তু আজকের সমাজে যখন বৈষম্য বাড়ছে, নির্যাতন বাড়ছে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার যেন নিত্যদিনের চিত্র, তখন এ ক্ষেত্রে ইনসাফের আহ্বান সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক।

এ ক্ষেত্রে কোরআনের সেই আয়াতগুলো বারবার মনে পড়ে, যেখানে বলা হয়েছে, ‘আমি ধ্বংস করেছি কত জনপদ, যেগুলোর বাসিন্দারা ছিল জালেম।’ (সুরা হজ ৪৫) কোরআনে বারবার সতর্ক করা হয়েছে সেই জুলুম সম্পর্কে, যে কারণে অনেক জাতি ধ্বংস হয়েছে। ফেরাউন, নমরুদ, আদ, সামুদ, লুতের কওম, সবাই ছিল ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ, ইনসাফ থেকে বঞ্চিত এবং জুলুমে নিমজ্জিত। আর তাই তাদের পরিণতিও হয়েছে ভয়াবহ। জালেম ও জালেমের সহযোগীদের জন্য এই জগতে লাঞ্ছনা ও মন্দ পরিণতি এবং পরকালে ভয়াবহ কঠিন শাস্তির দুঃসংবাদ রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা জালেমদের প্রতি ঝুঁকে পড়বে না, জালেমদের সহযোগী হবে না, তাহলে আগুন (জাহান্নাম) তোমাদের স্পর্শ করবে।’ (সুরা হুদ ১১৩) মহান আল্লাহর শাস্তি, আজাব ও গজবের পাকড়াও যেদিন আসবে, সেদিন জালেমকে বাঁচানোর কেউ থাকবে না। কোরআন মাজিদে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের (জালেমদের) সাবধান করে দাও আসন্ন দিন সম্পর্কে, যখন দুঃখ-কষ্টে তাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে। জালেমদের জন্য কোনো অন্তরঙ্গ বন্ধু নেই এবং যার গ্রহণযোগ্য কোনো সুপারিশকারীও নেই।’ (সুরা মুমিন ১৮) অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি জালেমদের জন্য আগুন প্রস্তুত করে রেখেছি, যার বেষ্টনী ওদের ঘিরে রাখবে। আর যদি ওরা পানির জন্য ফরিয়াদ করে, তবে ওদের পুঁজের মতো পানি দেওয়া হবে, যা ওদের চেহারা পুড়ে ফেলবে। কতই না নিকৃষ্ট পানীয় এবং কতই না নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল!’ (সুরা কাহাফ ২৯)

শান্তি, নিরাপত্তা ও সফলতার জন্য জুলুম থেকে বিরত থাকতে হবে এবং জুলুমমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জুলুম করা থেকে বাঁচার উপায় হলো, লোভ-লালসা, ক্ষমতার লিপ্সা, হিংসা, প্রতিশোধস্পৃহা ও ক্রোধ সংবরণ করা। জুলুমের মূল অর্থ হলো কোনো কিছু অপাত্রে রাখা। অযোগ্যদের দায়িত্ব দেওয়াও জুলুম। জুলুম ধ্বংস করে বিশ্বাস, সম্মান ও নিরাপত্তা। ইতিহাস সাক্ষী, কোনো জালেমের পরিণতি ভালো হয়নি এবং কোনো জুলুম দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। অনেক জালেমের দম্ভ, ক্ষমতা ও ঐশ্বর্য মুহূর্তেই ধুলোয় মিশে গেছে। কারণ ইনসাফের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানেই আল্লাহর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা জালেমদের দিকে ঝুঁকো না, তাহলে আগুন তোমাদের স্পর্শ করবে।’ (সুরা হুদ ১১৩) আল্লাহ আরও বলেন, ‘জালেমদের জন্য আগুন প্রস্তুত রয়েছে, যা তাদের ঘিরে রাখবে।’ (সুরা কাহাফ ২৯) এমন কঠিন ভাষায় কোনো অপরাধীর জন্য কোরআন বারবার হুঁশিয়ারি দেয়নি, যেমন দিয়েছে জালেমদের জন্য।

লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত