আকাশের দিকে তাকালে মানুষের মনে বিস্ময় জাগে। অসংখ্য নক্ষত্র, উজ্জ্বল চাঁদ, দীপ্তিমান সূর্য এবং অগণিত গ্রহের সুনিয়ন্ত্রিত বিচরণ যেন এক মহিমান্বিত ব্যবস্থাপনার সাক্ষ্য বহন করে। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ এই বিশাল মহাবিশ্বের রহস্য জানার চেষ্টা করেছে। আধুনিক বিজ্ঞান মহাকাশের বহু অজানা তথ্য উন্মোচন করলেও একটি বিষয় আজও স্পষ্ট, এই বিস্ময়কর শৃঙ্খলা কোনো আকস্মিক ঘটনার ফল নয়। এর পেছনে রয়েছে সর্বশক্তিমান স্রষ্টার নিখুঁত পরিকল্পনা ও নির্ভুল পরিচালনা। পবিত্র কোরআন মানুষকে আকাশের দিকে তাকাতে, সৃষ্টিজগতের নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করতে এবং সেখান থেকে মহান আল্লাহর ক্ষমতা ও একত্বের প্রমাণ উপলব্ধি করতে আহ্বান জানিয়েছে।
আসমান, জমিন এবং সমগ্র মহাবিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা ও মালিক মহান আল্লাহ। তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তা পরিচালনা করছেন এবং তারই আদেশে মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু নির্ধারিত নিয়মে চলমান। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, যিনি ছয় দিনে আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশে সমুন্নত হয়েছেন। দিনকে তিনি রাতের পর্দা দিয়ে ঢেকে দেন, তারা একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে এবং সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি তারই আজ্ঞাবহ। জেনে রেখো, সৃষ্টি তার, হুকুমও (চলবে) তার। বরকতময় আল্লাহ বিশ্বজগতের প্রতিপালক।’ (সুরা আরাফ ৫৪)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে, মহাবিশ্বের প্রতিটি নিয়ম এবং প্রতিটি পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে মহান আল্লাহর নিরঙ্কুশ কর্র্তৃত্ব। সূর্য প্রতিদিন উদিত হয়, চাঁদ নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘোরে এবং নক্ষত্ররাজি নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে। এগুলো কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ শক্তির কারণে নয়, বরং মহান আল্লাহর নির্ধারিত বিধানের কারণেই।
মহান আল্লাহ আকাশকে অপরূপ সৌন্দর্যে সুশোভিত করেছেন। রাতের আকাশে জ্বলজ্বলে নক্ষত্ররাজি মানুষের জন্য যেমন সৌন্দর্যের উৎস, তেমনি এগুলো মহান স্রষ্টার অসীম কুদরতেরও প্রকাশ। কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর তিনি দুই দিনে আসমানসমূহকে সাত আসমানে পরিণত করলেন। আর প্রত্যেক আসমানে তার কার্যাবলি ওহির মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন। আর আমি নিকটবর্তী আসমানকে প্রদীপমালার দ্বারা সুসজ্জিত করেছি এবং সুরক্ষিত করেছি। এ হলো মহাপরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নির্ধারণ।’ (সুরা ফুসসিলাত/১২)
এই আয়াতে আকাশের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এর নিরাপত্তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মুফাসসিরদের মতে, নিকটবর্তী আকাশকে মহান আল্লাহ তারকারাজি দ্বারা সুশোভিত করার পাশাপাশি শয়তানের অনুপ্রবেশ থেকেও সুরক্ষিত রেখেছেন। কোরআনের অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি নিকটবর্তী আকাশকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দ্বারা এবং ওগুলোকে করেছি শয়তানের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি।’ (সুরা মুলক/৫)
অর্থাৎ শয়তানরা যখন আসমানের সংবাদ চুরি করার চেষ্টা করে, তখন তাদের লক্ষ্য করে জ্বলন্ত উল্কা নিক্ষেপ করা হয়। এটি মহান আল্লাহর নির্ধারিত এক বিশেষ ব্যবস্থা, যা মানুষের অদৃশ্য জগৎ সম্পর্কে ইসলামের বিশ্বাসকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
গ্রহ-নক্ষত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতার কথাও কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। মানুষের দিকনির্ণয়ের জন্যও এগুলোকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। আধুনিক যন্ত্র আবিষ্কারের বহু আগে সমুদ্রযাত্রা কিংবা মরুভূমিতে পথ চলার সময় মানুষ নক্ষত্রের সাহায্যে পথ চিনত। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি তোমাদের জন্য নক্ষত্ররাজি সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা সেগুলোর সাহায্যে জলে-স্থলে অন্ধকারে পথের দিশা লাভ করতে পারো। আমি আমার নিদর্শনগুলোকে জ্ঞানীদের জন্য বিশদভাবে বর্ণনা করে দিয়েছি।’ (সুরা আনআম/৯৭)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, মহান আল্লাহর প্রতিটি সৃষ্টি মানুষের কল্যাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নক্ষত্র কেবল আকাশের অলংকার নয়, বরং মানুষের জীবনযাত্রারও একটি উপকারী উপাদান।
দুঃখজনকভাবে অনেক মানুষ যুগে যুগে গ্রহ-নক্ষত্র সম্পর্কে ভ্রান্ত বিশ্বাস পোষণ করেছে। কেউ মনে করে, মানুষের ভাগ্য নক্ষত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কেউ বিশ্বাস করে, নির্দিষ্ট নক্ষত্রের প্রভাবে সুখ-দুঃখ কিংবা বৃষ্টিপাত ঘটে। ইসলাম এসব বিশ্বাসকে সুস্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ উপকার বা ক্ষতির মালিক একমাত্র আল্লাহ।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি যখন আমার বান্দাদের ওপর অনুগ্রহ করি, তখন তাদের একদল তা অস্বীকার করে এবং বলে, অমুক নক্ষত্রের প্রভাবে আমাদের কাজ হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম/১৩৫)
এই হাদিসের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায়, নক্ষত্রকে ভাগ্য নির্ধারণকারী মনে করা ইমানের পরিপন্থী ধারণা। মুসলমান বিশ্বাস করে, সমস্ত কল্যাণ ও অকল্যাণ মহান আল্লাহর ইচ্ছা ও ফয়সালার অধীন।
আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের জানায়, মহাবিশ্বে প্রতিটি গ্রহ, নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি নির্দিষ্ট নিয়মে চলমান। তাদের মধ্যে মহাকর্ষ বল কাজ করে। আবার মহাবিশ্ব ক্রমাগত সম্প্রসারিতও হচ্ছে। এই সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার কারণেই মহাজাগতিক ভারসাম্য বজায় রয়েছে। একজন মুমিনের কাছে এসব বৈজ্ঞানিক সত্য আল্লাহর সৃষ্টির রহস্য আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ সৃষ্টি করে। কারণ কোরআন বহু আগেই ঘোষণা করেছে, সমগ্র জগৎ আল্লাহর নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন রাত, দিন, সূর্য ও চাঁদকে। আর নক্ষত্ররাজিও তার নির্দেশে নিয়োজিত। অবশ্যই এতে বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা নাহল/১২)
এই আয়াত মানুষকে শিক্ষা দেয়, মহাবিশ্বের প্রতিটি নিয়ম আল্লাহর নির্দেশের অধীন। বিজ্ঞান সেই নিয়ম আবিষ্কার করতে পারে, কিন্তু সেই নিয়মের স্রষ্টা হতে পারে না। সুতরাং প্রকৃত বিশ্বাসী ব্যক্তি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে আল্লাহর কুদরতের আরও একটি প্রমাণ হিসেবে দেখে।
তবে এই শৃঙ্খলা চিরস্থায়ী নয়। মহান আল্লাহ যখন ইচ্ছা করবেন, তখনই এই সুবিন্যস্ত মহাবিশ্বের সমাপ্তি ঘটবে। কেয়ামতের দিন সূর্য তার আলো হারাবে, নক্ষত্ররাজি নিভে যাবে এবং আকাশের বর্তমান শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যখন তারকারাজি আলোহীন হবে। যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে।’ (সুরা মুরসালাত/৮-৯)
লেখক : ইসলামি গবেষক