এক আয়োজকের ১৬-তে প্রবেশ

মাঠে তখন অতিরিক্ত সময়ের আবহ। অতিরিক্ত সময় আর টাইব্রেকারের চেনা সমীকরণ উঁকি দিচ্ছে। ঠিক তখনই (৯২তম মিনিটে) জন্সটনের ক্রস ডি-বক্সে ক্লিয়ার করে আফ্রিকান ডিফেন্ডার। তবে ফিরতি বলটি ডি-বক্সের বাইরে বুক দিয়ে নিয়ন্ত্রণে নেন স্টিফেন ইউস্তাকিও। সেখানে তার ডান পায়ের এক জোরালো হাফভলিতে দক্ষিণ আফ্রিকার গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বলটি যখন জালের ঠিকানা খুঁজে নিল, তখন কেবল একটি গোল হয়নি; সহ-আয়োজক কানাডা পৌঁছে গেল পুরুষ ফুটবল ইতিহাসের প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে (রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচ জিতে)। লস অ্যাঞ্জেলেসের গ্যালারি যখন লাল জার্সির উল্লাসে মাতোয়ারা, মাঠের নায়ক ইউস্তাকিও তখন হয়তো খুঁজছিলেন গ্যালারির কোনো চেনামুখ। গত এক বছরের ব্যবধানে মা এসমারাল্ডা ও বাবা আরমান্দোকে হারানো এই মিডফিল্ডারের পায়েই লেখা হলো কানাডার ফুটবলের সবচেয়ে স্মরণীয় রাত।

ম্যাচ শেষে নিজের এই অবিস্মরণীয় গোল নিয়ে বলতে গিয়ে ইউস্তাকিও বলেন, ‘আমরা শুধু বিশ্বাস রেখেছিলাম এবং চেষ্টা চালিয়ে গেছিলাম। আমি অন্য কোনোভাবে এর সমাপ্তি কল্পনাও করতে পারছি না। এটি সত্যিই একটি অসাধারণ গোল ছিল। আমি যখন শটটি নিই, আমার মনে হয়েছিল গ্যালারির সবাই যেন আমার সঙ্গে শটটি নিয়েছে।’

প্রিয় শিষ্যের এমন আবেগঘন মুহূর্ত দেখে ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি কানাডা কোচ জেসি মার্শ। ইউস্তাকিওর ব্যক্তিগত জীবনের এই কঠিন লড়াইয়ের কথা মনে করে তিনি বলেন, ‘আমি এর চেয়ে যোগ্য কোনো মানুষের কথা ভাবতেই পারি না। হয়তো এই মুহূর্তটি পাওয়ার সবচেয়ে বড় দাবিদার ছিল স্টিফেন নিজেই। ওপর থেকে ওর বাবা-মা আজ খেলা দেখেছেন, তারা এটা নিশ্চিতভাবেই দেখেছেন।’ ড্রেসিংরুমে ফিরে ফুটবলারদের জড়িয়ে ধরে মার্শ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘তোমরা আজ কানাডার বীর, এই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তোমরা আজ নায়ক।’

এই ১-০ ব্যবধানের জয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ১৬ নিশ্চিত করা কানাডিয়ানদের ড্রেসিংরুমের চিত্রটি ছিল দারুণ আবেগের। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠেই ক্র্যাচ হাতে উদযাপনে যোগ দেন কিছুদিন আগে অস্ত্রোপচার হওয়া ইসমায়েল কোনে। দলের প্রতি আমেরিকান কোচ মার্শের নিবেদনও ছিল চোখে পড়ার মতো; ম্যাচ শুরুর আগে গলা ছেড়ে গেয়েছেন কানাডার জাতীয় সংগীত, আর ম্যাচ শেষে জার্সির ক্রেস্টে চুমু খেয়ে মেতেছেন উল্লাসে।

অথচ মাঠের এই সাফল্য সহজে আসেনি। প্রথমার্ধের বিরতির ঠিক আগে ময়েস বোম্বিটোর হেড গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দেন দক্ষিণ আফ্রিকার অব্রে মোদিবা। ঠিক পরের মুহূর্তে রিচি লারিয়া ডি-বক্সে ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টির জোরালো দাবি তোলে কানাডা। তবে ভিএআর রিভিউতে তা নাকচ হলে ক্ষোভে ফেটে পড়ে গ্যালারি, এমনকি হাফ-টাইমে মাঠ ছাড়ার সময় রেফারির ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় কোচ মার্শকেও। বিরতির পর দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচটিকে টাইব্রেকারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে অতিমাত্রায় রক্ষণাত্মক কৌশল বেছে নিলে ম্যাচটি আরও কঠিন হয়ে ওঠে কানাডার জন্য। তবে সব ছাপিয়ে ইউস্তাকিওর সেই শটে ইতিহাস বনে গেল মার্শের দলটি।

অন্যপ্রান্তে, দলের গতি ও আধুনিক ফুটবলের শক্তির অভাবকে পরাজয়ের কারণ হিসেবে মেনে নিলেও, ২৪ বছর পর বিশ্বকাপে এসে নকআউটে খেলাকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ৭৪ বছর বয়সী বেলজিয়ান কোচ হুগো ব্রুস। একই সঙ্গে এটিই তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ বলে নিশ্চিত করেছেন এই অভিজ্ঞ কোচ। সেই প্রসঙ্গে ব্রুস বলেন, ‘যখন আমরা পেছনে তাকাই, আমার মনে হয় আমরা যা করেছি তা নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট হতে পারি। ২৪ বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকা শেষবার বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। সবাই আশা করেছিল, তবে কেবল কয়েকজনই বিশ্বাস করেছিল যে আমরা দ্বিতীয় রাউন্ডে পৌঁছাতে পারব। তাই ঠিক আছে, আমরা হতাশ কারণ আমরা জিততে চেয়েছিলাম এবং শেষ ১৬-তে যেতে পারলে সেটি একটি ছোটখাটো অলৌকিক ঘটনা হতো... আমি আমার দল নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত। নিশ্চিতভাবেই এটিই আমার শেষ বিশ্বকাপ।’

ইতিহাস গড়া এই জয়ের পর কানাডা দল অবশ্য থামতে রাজি নয়। আগামী ৪ জুলাই হিউস্টনে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তারা মুখোমুখি হবে নেদারল্যান্ডস অথবা মরক্কোর। প্রতিপক্ষকে সরাসরি পরখ করতে মেক্সিকোর মন্তেরেইতে ডাচ ও মরক্কো ম্যাচটি গ্যালারিতে বসে দেখতে ইতিমধ্যেই রওনা দিয়েছেন কোচ জেসি মার্শ। যেকোনো পরাশক্তিকে মোকাবিলা করতে তার দল যে প্রস্তুত, সেই হুঙ্কারও দিয়ে রেখেছেন তিনি।