বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এসে আর কোনো ম্যাচ সহজ থাকে না। এখানে একটি ভুলই বিদায়ের কারণ হতে পারে। তাই শেষ ৩২-এর প্রতিটি ম্যাচই আলাদা গুরুত্ব বহন করে। ফ্রান্স ও সুইডেনের ম্যাচটিও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে কাগজে-কলমে এবং বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় আমি স্পষ্টভাবেই ফ্রান্সকে এগিয়ে রাখব।
ফ্রান্সকে শক্তিশালী বলার সবচেয়ে বড় কারণ শুধু তাদের তারকা খেলোয়াড় নয়, বরং দল হিসেবে তারা কতটা পরিণত। অনেক দলই ব্যক্তিনির্ভর ফুটবল খেলে, কিন্তু ফ্রান্স দলীয় সমন্বয়ের ওপর ভর করেই প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে। ফ্রান্সের আক্রমণভাগে এমবাপ্পে ও উসমান ডেম্বেলের বোঝাপড়াটা দারুণ। দুজনের গতি, অবস্থান বদল এবং দ্রুত পাস আদান-প্রদান প্রতিপক্ষের রক্ষণকে বারবার বিপাকে ফেলে। এমবাপ্পে যখন বল নিয়ে সামনে এগিয়ে যান, ডেম্বেলের দৌড় ও স্পেস তৈরি করার ক্ষমতা তাকে আরও ভয়ংকর করে তোলে। একজন আক্রমণের ছন্দ তৈরি করেন, অন্যজন সেই ছন্দকে গতিতে রূপ দেন। এই সমন্বয়ই ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেয়।
এমবাপ্পের সবচেয়ে বড় শক্তি তার গতি। কিন্তু শুধু গতি থাকলেই একজন ফুটবলার বিশ্বসেরাদের কাতারে চলে যান না। তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, বল ছাড়া দৌড়, সঠিক সময়ে পাস দেওয়া কিংবা নিজেই গোল করার মানসিকতাÑ সব মিলিয়েই তিনি প্রতিপক্ষের জন্য ভয়ংকর। যখন ফ্রান্স দ্রুত আক্রমণে ওঠে, তখন এমবাপ্পেকে থামানো ডিফেন্ডারদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। একজন ডিফেন্ডার যদি তাকে আটকাতে সামনে এগিয়ে যান, তিনি পেছনের ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করেন। আর যদি দূরে দাঁড়িয়ে থাকেন, তাহলে গতির বিস্ফোরণে মুহূর্তেই তাকে পেছনে ফেলে যান।
শুধু এমবাপ্পে নন, ফ্রান্সের মিডফিল্ডও দারুণ ভারসাম্যপূর্ণ। মাঝমাঠ থেকে তারা বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে এবং সুযোগ বুঝে দ্রুত আক্রমণে রূপ নেয়। আধুনিক ফুটবলে ট্রানজিশনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রক্ষণ থেকে আক্রমণে যত দ্রুত যাওয়া যায়, প্রতিপক্ষকে তত বেশি অপ্রস্তুত অবস্থায় পাওয়া যায়। এই জায়গাতেই ফ্রান্স অন্য অনেক দলের চেয়ে এগিয়ে।
সুইডেনকে অবশ্য হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তারা শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল খেলে এবং রক্ষণভাগে যথেষ্ট সংগঠিত। তাদের খেলোয়াড়রা একে অপরকে ভালোভাবে কভার করে এবং সহজে জায়গা ছেড়ে দেয় না। সেটপিস থেকেও তারা বিপজ্জনক হতে পারে। ফলে ফ্রান্স যদি শুরু থেকেই অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক হয়ে যায়, তাহলে সুইডেন পাল্টা আক্রমণে সুযোগ তৈরি করতেই পারে।
তবে আমার মনে হয়, ম্যাচ যত এগোবে ফ্রান্সের বেঞ্চের শক্তিও বড় পার্থক্য গড়ে দেবে। বড় দলের একটি বড় সুবিধা হলো, বদলি খেলোয়াড় নামিয়েও ম্যাচের গতি বদলে দেওয়া যায়। প্রথম একাদশের মতোই বেঞ্চেও তাদের আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার রয়েছে। নকআউটের মতো কঠিন ম্যাচে এই গভীরতাই অনেক সময় জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে।
ফ্রান্সের আরেকটি বড় ইতিবাচক দিক হলো তাদের আত্মবিশ্বাস। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলার অভিজ্ঞতা তাদের আছে। চাপের মুহূর্তে কীভাবে শান্ত থাকতে হয়, কখন আক্রমণ বাড়াতে হবে কিংবা কখন বলের দখল ধরে রাখতে হবে, এসব বিষয়ে তারা পরিণত। বড় দলের পরিচয় এখানেই। সুইডেন যদি ম্যাচে টিকে থাকতে চায়, তাহলে প্রথম ৩০ মিনিট কোনোভাবেই গোল খাওয়া চলবে না। পাশাপাশি এমবাপ্পেকে ব্যক্তিগতভাবে মার্কিং করার চেয়ে পুরো দলের রক্ষণব্যবস্থাকে আরও ঘন করতে হবে। কারণ এমবাপ্পেকে থামাতে গিয়ে অন্যদের জন্য জায়গা তৈরি করে দিলে সেটাই আরও বড় বিপদ হয়ে দাঁড়াবে।
আমি মনে করি, ফ্রান্স শুরু থেকেই বলের দখল নিয়ে খেলবে এবং উইং ব্যবহার করে আক্রমণ সাজাবে। তাদের দ্রুত পাস, অবস্থান পরিবর্তন এবং গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুইডেনের রক্ষণকে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে হবে। কিন্তু ৯০ মিনিট ধরে সেই চাপ সামলানো সহজ হবে না।
সব মিলিয়ে ম্যাচটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও ফ্রান্সের জয়ের সম্ভাবনাই বেশি দেখছি। কারণ তাদের বর্তমান ফর্ম, খেলোয়াড়দের মান, আক্রমণের বৈচিত্র্য এবং দলীয় সমন্বয় সবকিছুই সুইডেনের চেয়ে এগিয়ে। এমবাপ্পে যদি নিজের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে পারেন এবং অধিনায়কের সঙ্গে বোঝাপড়া আগের মতোই কার্যকর থাকে, তাহলে ফ্রান্সের জন্য শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করাটা কঠিন হওয়ার কথা নয়।