রসিকতা করা মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি। আন্তরিকতা, সৌহার্দ ও ভালোবাসা প্রকাশের একটি সহজ মাধ্যমও এটি। তবে ইসলাম রসিকতার ক্ষেত্রে সংযম, শালীনতা ও সত্যবাদিতার শিক্ষা দেয়। এ কারণেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে আমরা যেমন গাম্ভীর্য ও মর্যাদার অপূর্ব সমন্বয় দেখি, তেমনি দেখি নির্মল, হৃদয়গ্রাহী ও শিক্ষণীয় রসিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত। তার রসিকতা কখনো কাউকে অপমান বা কারও মনে কষ্ট দেওয়ার জন্য ছিল না এবং রসিকতায় কখনোই মিথ্যার সংমিশ্রণ ছিল না। বরং তার রসিকতায় ছিল শিক্ষা, স্নেহ ও মানবিকতার স্পর্শ।
একদিন সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি আমাদের সঙ্গে কৌতুক করেন?’ তিনি জবাবে বললেন, ‘হ্যাঁ। তবে আমি কৌতুকের ছলেও সত্য ছাড়া কিছু বলি না।’ (শামায়েলে তিরমিজি)
এই একটি হাদিসই ইসলামে রসিকতার মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। অর্থাৎ হাস্যরস বৈধ, কিন্তু তা অবশ্যই সত্যভিত্তিক হতে হবে। মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলা, কাউকে হেয় করা বা প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়।
শিশুদের প্রতি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্নেহ ছিল অসাধারণ। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, তার ছোট ভাইয়ের একটি পাখি ছিল। নাম ছিল ‘নুগায়ের’। পাখিটি মারা গেলে তার ছোট ভাই খুব মন খারাপ করে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে স্নেহভরে বললেন, ‘হে আবু উমায়ের! কী হলো নুগায়ের?’ (শামায়েলে তিরমিজি) এই সংক্ষিপ্ত কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে শিশুমনের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। তিনি শিশুর দুঃখকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং একটি কোমল রসিকতার মাধ্যমে তার মন ভালো করার চেষ্টা করেছেন।
একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনাস (রা.)-কে স্নেহভরে সম্বোধন করে বললেন, ‘হে দুই কানবিশিষ্ট!’ (শামায়েলে তিরমিজি) কথাটি শুনতে কৌতুকপূর্ণ হলেও এতে কোনো বিদ্রƒপ ছিল না। বরং এটি ছিল ভালোবাসাপূর্ণ একটি সম্বোধন, যা আনাস (রা.)-এর প্রতি তার আন্তরিকতার প্রকাশ।
নবীজির রসিকতার আরেকটি চমৎকার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় এক সাহাবির সঙ্গে তার কথোপকথনে। এক ব্যক্তি তার কাছে একটি বাহন চাইলেন। তিনি বললেন, ‘আমি তোমাকে একটি উটনীর বাচ্চা দেব।’ লোকটি অবাক হয়ে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি উটনীর বাচ্চা দিয়ে কী করব?’ তখন তিনি হাসিমুখে বললেন, ‘সব উটই তো কোনো না কোনো উটনীর বাচ্চা।’ (শামায়েলে তিরমিজি)
এখানে তিনি এমন একটি সত্য কথা বলেছেন, যা প্রথমে শুনে বিভ্রান্তি তৈরি হলেও পরে তা আনন্দের কারণ হয়েছে। এ ধরনের রসিকতা ছিল তার ভাষার সৌন্দর্য ও প্রজ্ঞার পরিচয়।
এক বৃদ্ধ মহিলা একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে জান্নাতে প্রবেশের জন্য দোয়া চাইলেন। তিনি বললেন, ‘কোনো বৃদ্ধ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ কথাটি শুনে মহিলা কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলেন। তখন নবীজি সাহাবিদের বললেন, তাকে জানিয়ে দাও, তিনি বৃদ্ধ অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করবেন না। কারণ মহান আল্লাহ জান্নাতবাসীদের নতুনরূপে সৃষ্টি করবেন। এরপর তিনি তেলাওয়াত করলেন, ‘আমি তাদের বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাদের করেছি চিরকুমারী।’ (সুরা ওয়াকিয়া ৩৫-৩৬, শামায়েলে তিরমিজি) এই ঘটনাতেও দেখা যায়, তার রসিকতা ছিল সত্যনির্ভর এবং ইমান ও আখেরাতের শিক্ষায় পরিপূর্ণ।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের এসব ঘটনা আমাদের শেখায়, ইসলাম গম্ভীরতার ধর্ম হলেও তা হাসি ও আনন্দবিমুখ নয়। বরং মানুষের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তুলতে, হৃদ্যতা সৃষ্টি করতে এবং মনকে প্রফুল্ল রাখতে পরিমিত রসিকতায় উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে সেই রসিকতা হতে হবে সত্যভিত্তিক, শালীন ও কল্যাণকর। সেটার দ্বারা কাউকে অপমান করা যাবে না, ভয় দেখানো যাবে না, উপহাস করা যাবে না এবং মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া যাবে না।