তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অনন্য গবেষক

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:০২ এএম

জ্ঞানপিপাসা, অধ্যবসায় ও সত্যের প্রতি অটল নিষ্ঠা একজন সাধারণ মানুষকে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি এনে দিতে পারে। কখনো কখনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে আত্মপ্রচেষ্টা। সীমিত সুযোগও তখন অসীম সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। এমনই এক বিস্ময়কর মনীষীর নাম শায়খ আহমেদ হুসাইন দিদাত। যুক্তির দীপ্তি, অসাধারণ স্মৃতিশক্তি এবং ইসলামের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আধুনিক যুগের অন্যতম প্রভাবশালী দাঈ ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অনন্য গবেষক।

১৯১৮ সালের ১ জুলাই গুজরাটের সুরাট অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন আহমেদ হুসাইন দিদাত। তার জন্মের কিছুদিন পরই জীবিকার সন্ধানে তার বাবা হুসাইন দিদাত দক্ষিণ আফ্রিকায় চলে যান। ছোট্ট আহমেদ মায়ের সঙ্গেই ভারতে বেড়ে ওঠেন। প্রায় নয় বছর পর বাবার ডাকে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা শেষে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে পৌঁছান। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ এবং সম্পূর্ণ অপরিচিত ইংরেজি ভাষা তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু অসাধারণ মেধার অধিকারী আহমেদ মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ইংরেজি ভাষা রপ্ত করে ক্লাসে প্রথম স্থান অর্জন করেন।

তবে দারিদ্র্য তার শিক্ষা জীবনের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে ষষ্ঠ শ্রেণির পরই তাকে পড়াশোনা ছেড়ে জীবিকার জন্য কাজে নেমে যেতে হয়। অনেকের জীবন এখানেই থেমে যায়। কিন্তু আহমেদ দিদাতের জীবন তখনই নতুন পথে যাত্রা শুরু করে। তিনি বুঝেছিলেন, আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ হলেও জ্ঞানার্জনের পথ কখনো বন্ধ হয় না।

কিশোর বয়সে তিনি একটি দোকানে চাকরি নেন। সেই দোকানের পাশেই ছিল খ্রিস্টান মিশনারিদের একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র। সেখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মিশনারিরা প্রায়ই দোকানে এসে ইসলামের সমালোচনা করত এবং তাকে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি করত। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য এবং ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ শুনে তিনি বিব্রত হতেন। কারণ তখন তার কাছে সেসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিল না। কিন্তু এই অভিজ্ঞতাই তার জীবন বদলে দেয়।

একদিন দোকান পরিষ্কার করতে গিয়ে তিনি হাতে পান ‘ইজহারুল হক’ নামের একটি বিখ্যাত গ্রন্থ। মুসলিম আলেম ও খ্রিস্টান ধর্মযাজকের মধ্যকার যুক্তিনির্ভর সংলাপভিত্তিক এই বই তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। এরপর শুরু হয় তার নিরলস অধ্যয়ন। তিনি বাইবেল, কোরআন, তাফসির, ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্বের অসংখ্য বই পড়তে থাকেন। পড়াশোনার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও উদ্ধৃতি নিজের খাতায় লিখে রাখতেন। এভাবেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়েও তিনি হয়ে ওঠেন তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের একজন অসাধারণ গবেষক।

১৯৪২ সালে ডারবানের অ্যাভালন হলে তিনি প্রথম জনসভায় বক্তৃতা দেন। বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘মুহাম্মদ শান্তির বার্তাবাহক’। উপস্থিতি ছিল খুবই সীমিত। কিন্তু তার যুক্তিপূর্ণ উপস্থাপনা, সাবলীল ভাষা ও আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অল্প সময়ের মধ্যেই তার বক্তৃতার স্থান ছোট হল থেকে বড় মিলনায়তনে পৌঁছে যায়। হাজার হাজার মানুষ তার বক্তব্য শুনতে আসতে শুরু করে।

পরবর্তী চার দশকে আহমেদ দিদাত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অসংখ্য বক্তৃতা ও উন্মুক্ত বিতর্কে অংশ নেন। বিশেষ করে খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের সঙ্গে তার প্রকাশ্য বিতর্ক বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। আমেরিকার টেলিভিশন উপস্থাপক জিমি সোয়াগার্ট, জশ ম্যাকডাওয়েল, ফ্লয়েড ক্লার্কসহ অনেক প্রখ্যাত ধর্মপ্রচারকের সঙ্গে তার বিতর্ক ব্যাপক সাড়া ফেলে। তিনি বাইবেলের অসংখ্য অধ্যায় ও আয়াত মুখস্থ বলতে পারতেন। প্রতিপক্ষের প্রশ্নের জবাবে মুহূর্তের মধ্যে বাইবেল থেকেই উদ্ধৃতি দিয়ে যুক্তি উপস্থাপন করতেন। এ কারণে অনেকে তাকে কোরআনের চেয়ে বাইবেলের বড় গবেষক বলেও অভিহিত করতেন।

তার লক্ষ্য কখনো কাউকে অপমান করা ছিল না। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ মানুষের মধ্যে সত্য অনুসন্ধানের পথ খুলে দেয়। তার বক্তব্য ছিল, মানুষকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হবে, বলপ্রয়োগ করে নয়। ইসলামের দাওয়াত হতে হবে প্রজ্ঞা, সুন্দর উপদেশ এবং যুক্তির মাধ্যমে। এ নীতিই তার পুরো দাওয়াতি জীবনের ভিত্তি ছিল।

আহমেদ দিদাত একজন প্রভাবশালী লেখকও ছিলেন। তিনি বিশটির বেশি বই রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ক্রুসিফিকশন অর ক্রুসি-ফিকশন?’, ‘হোয়াট দ্য বাইবেল সেইজ অ্যাবাউট মুহাম্মদ’, ‘ইজ দ্য বাইবেল গডস ওয়ার্ড?’ ইত্যাদি। তার বই বিশে^র বহু ভাষায় অনূদিত হয় এবং লাখ লাখ কপি পাঠকের হাতে পৌঁছে যায়। তার লেখা মুসলিম সমাজকে কোরআন আরও গভীরভাবে অধ্যয়নের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

১৯৫৭ সালে বন্ধু গোলাম হুসাইন ভ্যাঙ্কারের সঙ্গে তিনি ডারবানে প্রতিষ্ঠা করেন ইসলামিক প্রোপাগেশন সেন্টার। পরবর্তীকালে এটি ইসলামিক প্রোপাগেশন সেন্টার ইন্টারন্যাশনাল নামে পরিচিতি লাভ করে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বই প্রকাশ, প্রশিক্ষণ, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ, দাওয়াতি কার্যক্রম এবং ইসলামি সাহিত্য বিতরণের বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয়। তিনি আরও একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে মুসলিমদের তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব শেখানো হতো, যাতে তারা যুক্তিনির্ভরভাবে ইসলামের পরিচয় তুলে ধরতে পারে।

বিশ্বব্যাপী অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৬ সালে তিনি মর্যাদাপূর্ণ বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হন। দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাও তার অবদানের প্রশংসা করেছিলেন। ম্যান্ডেলা একবার বলেছিলেন, বিদেশ সফরে গেলে বহু মানুষ তার কাছে শেখ আহমেদ দিদাতের খোঁজ নিত। এতে সহজেই বোঝা যায়, মুসলিম বিশে^ তার জনপ্রিয়তা কতটা বিস্তৃত ছিল।

১৯৯৬ সালের ৩ মে তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। এতে তার পুরো শরীর অবশ হয়ে যায়। এরপর থেকে চোখের ইশারায় বর্ণমালার ছক ব্যবহার করে তিনি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যান। শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ অসহায় হলেও তার চিন্তার শক্তি ও মানসিক দৃঢ়তা অটুট ছিল। ২০০৫ সালের ৮ আগস্ট কিডনি জটিলতায় তিনি ইন্তেকাল করেন।

লেখক : ইসলামি গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত