বৈঠক নিয়ে ট্রাম্প-ইরানের ভিন্ন সুর

কয়েক দফায় ইটের বদলে পাটকেল ছোড়াছুড়ির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবার কূটনীতির টেবিলে ফিরতে সম্মত হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত অবসানে স্থায়ী একটি চুক্তিতে উপনীত হতে গতকাল মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল (তবে, এ প্রতিবেদন লেখার আগ পর্যন্ত বৈঠকের কোনো খবর পাওয়া যায়নি)। উপরন্তু দোহায় বৈঠক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির বিপরীতে অবস্থান করছে ইরান। হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে,  ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং তার দূত স্টিভ উইটকফ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিতে মঙ্গলবার দোহায় পৌঁছাবেন। পাশাপাশি অন্যান্য কারিগরি বৈঠকও চলবে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, এমন কোনো পরিকল্পনা আপাতত তাদের নেই। তেহরান বলছে, দোহা সফরে ইরানি প্রতিনিধিদল দেশটির অবরুদ্ধ সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়টি উত্থাপন করবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ইরান একটি বৈঠকের অনুরোধ করেছে এবং মঙ্গলবার দোহায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তবে ট্রাম্পের এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই। তিনি বলেন, আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো পর্যায়েই আমাদের কোনো বৈঠকের বিষয় চূড়ান্ত নয়। তিনি আরও স্পষ্ট করেন, ইরানের একটি কারিগরি প্রতিনিধিদল এ সপ্তাহে কাতার সফর করবে ঠিকই, তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সফরের সঙ্গে এর ‘কোনো সম্পর্ক নেই’। ইরানের ভাষ্য- এই প্রতিনিধিদলের সফরের উদ্দেশ্য দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক আলোচনার পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনা নয়; বরং সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করাই তাদের মূল লক্ষ্য। ইরানের একজন সিনিয়র কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, দোহায় এই বৈঠক কেবল হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনা এবং উত্তেজনা হ্রাসের আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আজ বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি আলোচকরা কাতারি ও পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে পৃথকভাবে সাক্ষাৎ করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্প হোয়াইট হাউজের ওভাল দপ্তরে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘দোহার বৈঠকটি সম্ভবত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে, সম্ভবত নয়। আমরা খতিয়ে দেখব’।

ইরানের অভিযোগ, সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত ধীর। বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত প্রথম অনুচ্ছেদ বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের নানা আপত্তি, সমালোচনা ও উদ্বেগ রয়েছে। এছাড়া সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম অনুচ্ছেদ বাস্তবায়ন নিয়েও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ইরানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর আগে ৬০ দিনের আলোচনাকালে হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল নিয়ন্ত্রণের অধিকার তাদের রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ভিন্ন। ওয়াশিংটনের মতে, ইরানকে নৌচলাচলে কোনো বাধা না দিয়ে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে হবে। আলোচনায় ইরানি প্রতিনিধিদল প্রথম ধাপে কাতারে আটকে থাকা ৬০০ কোটি ডলার ছাড়ের ঘোষণা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দেবে বলে জানিয়েছে ইরান।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে ইসরায়েল এবং লেবাননের ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাতের অবসানের বিধানও রাখা হয়েছে। তবে হিজবুল্লাহর মিত্র ও লেবাননের শক্তিশালী পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরি ওই যুদ্ধ বন্ধে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে মার্কিন-মধ্যস্থতায় হওয়া আলাদা একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিটি দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারকে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ায় সংকটকে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও অচল করার ঝুঁকিতে ফেলছে।