যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল নীতিতে পরিবর্তন!

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:০৭ এএম

ঐতিহাসিকভাবেই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ আশীর্বাদই ইসরায়েলকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। ওয়াশিংটনের ছত্রছায়াতেই ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়াসহ পশ্চিম এশিয়ার একটি বড় অংশজুড়ে দখলদারিত্ব ও আগ্রাসন চালিয়ে আসছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানেও উপসাগরীয় অঞ্চলে ইসরায়েলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করা আছে। সবমিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক ‘ব্যতিক্রমী মিত্র’ হয়ে উঠেছিল ইসরায়েল; যা ওয়াশিংটনের অন্যান্য মিত্রদের সম্পর্কের সম্পূর্ণ বিপরীত এক চিত্র। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্রপটে পরিবর্তন আসার বিষয়টি ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম পলিটিকো দাবি করেছে, ইসরায়েলের নীতির এই পরিবর্তন খতিয়ে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে আর ছাড় পাচ্ছে না ইসরায়েল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্রের বরাতে পলিটিকো জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ক্রমে ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কৌশলগত নীতি অনুসরণ করছে, যা তারা অন্যান্য মিত্র দেশের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে থাকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইসরায়েলি রাজনৈতিক উপদেষ্টাও পলিটিকোকে একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলের ধারণা ছিল, তারা ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আওতার বাইরে থাকবে। ওই উপদেষ্টা এ নিয়ে বলেন, ‘আমরা সরলভাবে ধরেই নিয়েছিলাম, ব্যতিক্রম হিসেবে আমাদের আমেরিকা ফার্স্ট নীতির বাইরে রাখা হবে; যদিও এ অবস্থা বেশি দিন টেকার কথা ছিল না। চার বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সব পররাষ্ট্রনীতিগত সিদ্ধান্তে আমরা ব্যতিক্রমী মিত্র হিসেবে থাকতে পারছিলাম না।’ পলিটিকোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনে ইসরায়েলের বিষয়ে নীতিগত এ পরিবর্তনের পক্ষে অন্যতম জোরাল সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি অস্বাভাবিক রকম খোলাখুলি ইসরায়েলের নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনা করেছেন। ভ্যান্স ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলের ‘একমাত্র শক্তিশালী মিত্র’। একই সঙ্গে তিনি ওয়াশিংটনের সমর্থনকে নিশ্চিত বা স্বতঃসিদ্ধ ধরে না নেওয়ার ব্যাপারে ইসরায়েলকে সতর্ক করেন বলে পলিটিকোর প্রতিবেদনে বলা হয়।

যদিও ট্রাম্পের পূর্বসূরী বাইডেনের ক্ষমতাকালের শেষ দিক থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টানাপড়েন বাড়তে থাকে। গাজায় গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের কারণে বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের সমালোচনার মুখে ওই সময় নেতানিয়াহু সরকারের ওপর প্রতি সমর্থনের দড়ি গিট কিছুটা হালকা হয়েছিল। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর সে দৃশ্যে পরিবর্তন আসে। বন্ধু বিবি’র (নেতানিয়াহু) সঙ্গে ট্রাম্পের রসায়ন বাড়ছিলই; এমনকি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতি মামলা থেকে তাকে রেহাই দেওয়ার জন্য ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট অ্যাইজ্যাক হারজগকে চিঠি লিখে অনুরোধও করেছিলেন ট্রাম্প। তবে সে সবই এখন অতীত হতে চলেছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সবশেষ সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য কটাক্ষের মুখে পড়েছেন ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কেননা, ট্রাম্পের নির্দেশ উপেক্ষা করে লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল ইসরায়েল; যা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তি প্রায় ভেস্তে দিয়েছিল। সম্প্রতি নেতানিয়াহুও ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন।

দুই দেশের সরকারের মধ্যে উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগও কমে এসেছে বলে পলিটিকোর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ দাবির পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে পলিটিকো বলেছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২০২৫ সালে পাঁচবার ওয়াশিংটন সফর করেছিলেন। তবে ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত মাত্র একবার সফর করেছেন। সেটাও ছিল গত ফেব্রুয়ারিতে। এ বিষয়ে অবগত একটি সূত্রের বরাত দিয়ে পলিটিকো জানিয়েছে, হোয়াইট হাউজে নেতানিয়াহুর আরেকটি সফরের সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত বিবেচনায় নেই। একই সঙ্গে দুই দেশের সরকারের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগও আগের তুলনায় কমে গেছে। ওই সূত্র সতর্ক করে আরও বলেছে, ‘সবচেয়ে খারাপ সময় আসা এখনো বাকি’।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত