ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ সংসদীয় আসনে বেসরকারিভাবে বিজয়ী বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল করেছে সর্বোচ্চ আদালত। তার প্রার্থিতার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকীর করা আপিল মঞ্জুর করে গতকাল মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত আপিল বেঞ্চ এ রায় দেন।
আপিল বিভাগের এ রায়ের কারণে আসলাম চৌধুরী শপথ নিতে পারবেন না। ফলে ওই আসনে এখন কী হবে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। ঋণখেলাপির অভিযোগের মধ্যে গত ১৮ জানুয়ারি আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র নিয়ে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল শুনানির পর বৈধ ঘোষণা করা হয়। ইসির এ সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে ব্যাংক এশিয়ার করা রিট আবেদন হাইকোর্ট খারিজ করে দেয়। পরে হাইকোর্টের এই খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি) করেন জামায়াতের প্রার্থী মো. আনোয়ার সিদ্দিকী। গত ৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহালের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে আদেশ দেয়। ফলে তার নির্বাচন করার সুযোগ মেলে।
তবে, আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফলাফল স্থগিত রাখা এবং ফলাফল প্রকাশ করা যাবে না বলে আদেশ দেয় আপিল বিভাগ। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থীকে পরাজিত করে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হন আসলাম চৌধুরী। তবে, আপিল বিভাগের আদেশের কারণে ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।
আপিল বিভাগে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। ব্যাংক এশিয়ার পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামাল উল আলম ও আইনজীবী এএসএম ইলিয়াস হায়দার। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। অন্যদিকে আসলাম চৌধুরীর পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী ও ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন।
এখন কী হবে : আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল করে রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ওই আসনে জামায়াত প্রার্থীর আইনজীবী শিশির মনির গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, আসলাম চৌধুরী ঋণখেলাপি হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, ‘এই রায়ের মাধ্যমে নির্বাচনে তার এই অংশগ্রহণ অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। অর্থাৎ আসলাম চৌধুরী অযোগ্য প্রার্থী হলেন। আর অযোগ্য প্রার্থী হওয়ার পরে আসনটিতে (চট্টগ্রাম-৪) কী হবে, তা আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে বিস্তারিত জানা যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কোনো আসনে প্রথম হওয়া ব্যক্তি অযোগ্য হলে সাধারণত ভোটে দ্বিতীয় যিনি থাকেন তাকে নির্বাচিত হিসেবে ঘোষণা করাই সাধারণ নিয়ম। কিন্তু এর বাইরেও আপিল বিভাগ বিশেষ কোনো নির্দেশনা দেন কি না, সেটি পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে জানা যাবে।’
অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, চট্টগ্রাম-৪ আসনে আবার নির্বাচন হলে আসলাম চৌধুরীর অংশ নিতে বাধা থাকবে না। তিনি বলেন, একজন ব্যক্তির একটি নির্দিষ্ট সময়ের অযোগ্যতা তো সারা জীবন থাকবে না। তিনি (আসলাম চৌধুরী) হয়তো সেই নির্বাচনের ফলাফলটি ভোগ করতে পারবেন না এবং পরের নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি যদি সে অযোগ্যতা কাটিয়ে যোগ্য হন, তার তো নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা থাকার কথা না।’
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর রিভিউ আবেদন করবেন বলে জানিয়েছেন আসলাম চৌধুরী। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, আপিল বিভাগের এ রায়ে জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন হয়নি। পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর রিভিউ করার সুযোগ থাকবে এবং রিভিউর মাধ্যমে আমরা বিজয়ী হব।
আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিলসংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় গতকাল সীতাকুণ্ডে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন তার সমর্থকরা। এতে মহাসড়কে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। উপজেলার অন্তত ১০টি স্থানে বিক্ষোভকারীরা মহাসড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে এবং সড়ক বিভাজকের মাঝখানে থাকা গাছ কেটে ব্যারিকেড সৃষ্টি করেন। সবচেয়ে বড় ব্যারিকেড দেওয়া হয় বারৈয়ারঢালা ইউনিয়নের ছোট দারোগারহাট এলাকায়। এ সময় কয়েকটি স্থানে টায়ারে আগুন জ¦ালিয়ে সড়কে অবস্থান নেন বিক্ষোভকারীরা। অবরোধের ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রামমুখী উভয় লেনেই যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, সীতাকুণ্ড মডেল থানা পুলিশ ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের একটি বিশেষ দল ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যারিকেড অপসারণ করে যান চলাচল স্বাভাবিক করে।