টাঁকশালের শত মিলিয়ন ডলার প্রকল্পে অনিয়ম

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ০৫:০২ এএম

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন খাতে পরিবর্তনের দাবি জোরালো হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক ও দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন বাংলাদেশ লিমিটেডে (টাঁকশাল) এখনো বহাল ফ্যাসিবাদের দোসরদের সমন্বয়ে গড়া একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।

সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মো. আশরাফুল আলমের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট টাঁকশালের শত মিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক প্রকল্পের নামে সরকারি অর্থ লুট করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি সরকারের উচ্চপর্যায়ে টাঁকশালের এসব প্রকল্পসহ প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কর্মকা-ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ করা হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। অভিযোগে বলা হয়েছে ১৯৭২ সালের পুরনো মেশিনকে ২০২৩ মডেলে রূপান্তর, অভি অ্যান্ড স্পার্ক প্রযুক্তি প্রকল্প এবং ডিজাইন ও অরিজিনেশন প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় ও লুটপাট করা হচ্ছে। এ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমন এবং সরকারের অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে নিয়ম-বহির্ভূতভাবে বিপুল পরিমাণ টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ার অভিযোগও রয়েছে।

১৯৭২ সালের মেশিনকে ২০২৩ মডেলে রূপান্তরের প্রকল্প : অভিযোগে বলা হয় টাঁকশালে ব্যবহৃত ১৯৭২ সালের পুরনো মুদ্রণযন্ত্রকে ওভারহোলিং বা সংস্কার করে ২০২৩ সালের প্রযুক্তিতে রূপান্তরের নামে একটি ব্যয়বহুল প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির আপত্তি উপেক্ষা করে প্রকল্পটিতে অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, কোনো নতুন কার্যকারিতা যোগ না করেই কাগজে-কলমে আধুনিকায়নের নামে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ দেখানো হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, টাঁকশালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উৎপাদন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নতুন মেশিন স্থাপনের পরিবর্তে পুরনো মেশিনের ওভারহোলিংয়ে আগ্রহী। কারণ এতে ব্যয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ বেশি। পুরনো মেশিন সংস্কারে ২০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও নতুন আধুনিক মেশিন স্থাপনে খরচ হবে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। শুধু নিজেরা লাভবান হতেই নতুন মেশিন স্থাপন না করে পুরনো মেশিনকে ওভারহোলিং করা হচ্ছে।

ওভারহোলিং বিষয়ে প্রকৌশলীদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা : ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর টাঁকশালের দুই সাবেক সিনিয়র প্রকৌশলী ওভারহোলিংয়ের বিষয়ে সতর্ক করে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের কাছে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে তারা বলেন, ২০১৬ সালে নতুন চারটি ব্যাংক নোট মুদ্রণযন্ত্র স্থাপনের পর প্রায় ৪০ বছরের পুরনো মেশিনগুলোকে ওভারহোলিং করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বিশ্বের প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে এবং ১৫-২০ বছরের বেশি পুরনো প্রযুক্তি এখন অচল। পুরনো মেশিনগুলোকে ওভারহোলিং করলেও আধুনিক নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যাংক নোট মুদ্রণ সম্ভব নয়। এসব মেশিনের যন্ত্রাংশও এখন আর বাজারে সহজলভ্য নয়। যন্ত্রাংশ আলাদাভাবে অর্ডার দিয়ে তৈরি করতে হয়, যার দাম কয়েকগুণ বেশি এবং সরবরাহে অনেক সময় লাগে।

প্রকৌশলীরা বলেন, পুনো মেশিনে সূক্ষ্ম ও নিরাপদ মুদ্রণ সম্ভব না হওয়ায় ব্যাংক নোটে ত্রুটি থেকে যেতে পারে, যা জালনোট তৈরির ঝুঁকি বাড়াবে। তাদের মতে, ওভারহোলিংয়ের মাধ্যমে মেশিনের মৌলিক প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয়। তাদের সর্তকবার্তা না মেনে লুটপাটের আশায় পুরনো মেশিন ওভারহেলিং করার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

পুরনো প্রযুক্তিতে খরচ অনেক : অভিযোগ অনুযায়ী, গত শতকের আটের দশকে স্থাপিত সুইস ও জার্মান মেশিনগুলো এখন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও আর তৈরি করে না। ফলে ছোট যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হলেও তা বিশেষভাবে তৈরি করাতে হয়। এতে স্বাভাবিক ব্যয়ের কয়েকগুণ বেশি অর্থ খরচ হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন না থাকলেও একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক যন্ত্রাংশ তৈরি করাতে হয়, যার বেশিরভাগই পরে অব্যবহৃত থেকে যায়। এ ছাড়া পুরনো মেশিনগুলো ‘ডাইরেক্ট প্রিন্টিং’ প্রযুক্তিনির্ভর। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ‘ইনডাইরেক্ট প্রিন্টিং’ প্রযুক্তিতে প্রায় ৩০ শতাংশ কম কালি লাগে। ব্যাংক নোট মুদ্রণের মোট ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ কালির পেছনে যায়। ফলে পুরনো প্রযুক্তি ব্যবহার অব্যাহত রাখলে উৎপাদন ব্যয়ও অস্বাভাবিকভাবে বেশি হয়।

উৎপাদন-ক্ষমতা কমে এক-চতুর্থাংশ : অভিযোগে বলা হয়েছে নতুন মেশিনে ঘণ্টায় ১১ থেকে ১২ হাজার শিট ছাপানো সম্ভব হলেও টাকশালের পুরনো মেশিনগুলো স্থাপনের সময় যেখানে ঘণ্টায় প্রায় ৮ হাজার শিট ছাপনো হতো, এখন তা কমে ২ থেকে আড়াই হাজার শিটে নেমেছে। ওভারহোলিংয়ের পরও উৎপাদন-ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব নয়। ফলে কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যাবে না।

অভি অ্যান্ড স্পার্ক প্রকল্পে অনিয়ম : অভিযোগে বলা হয়েছে, নোট মুদ্রণের সংবেদনশীল প্রযুক্তি অভি অ্যান্ড স্পার্ক চালুর নামে সরকারি কোষাগার থেকে শত শত মিলিয়ন ডলার খরচ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে আশরাফুল আলমের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা ও টাকশালের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাফায়েত আরেফিনের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে। প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন ও জালনোটের ঝুঁকি : অভিযোগে বলা হয়েছে, নতুন ব্যাংক নোটের ডিজাইন ও অরিজিনেশন প্রকল্পে নিম্নমানের ও ত্রুটিপূর্ণ নকশা ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হওয়ার পাশাপাশি দেশে জালনোটের ঝুঁকি বেড়েছে। নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য দুর্বল হওয়ায় নকল প্রতিরোধকব্যবস্থা নিশ্চিত করাও সম্ভব হয়নি।

৬০ হাজার কোটি টাকা ছাপানোর অভিযোগ :  সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো বিপুল পরিমাণ নতুন টাকা ছাপানো। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টাকশাল থেকে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার নতুন মুদ্রা বাজারে ছাড়া হয়। ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরেও বিপুল পরিমাণ টাকা ছাপানো হয়েছে। সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ কয়েক বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার নতুন মুদ্রা বাজারে ছাড়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, ওই সময় টাকশালের কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার, টাকশালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফোরকান হোসেন এবং উৎপাদন বিভাগের জিএম আশরাফুল আলম। তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকার কারণেই এ বিপুল পরিমাণ মুদ্রা বাজারে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরনো ও ক্ষতিগ্রস্ত নোট প্রতিস্থাপনের জন্য নিয়মিত নতুন নোট ছাপানো বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাভাবিক কাজ। তবে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হারে নোট ছাপালে তা মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অভিযোগকারীরা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানের পরও টাকশাল ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বহাল থাকায় প্রকৃত সংস্কার সম্ভব হচ্ছে না। তারা অবিলম্বে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অপসারণ, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক অডিট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টাকশালের কার্যক্রমের ফরেনসিক অডিট করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, দুর্নীতি দমন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিরপেক্ষ তদন্ত করলে প্রকল্পভিত্তিক অর্থ অপচয়, অতিরিক্ত ব্যয়, মুদ্রণ কার্যক্রমের অনিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসবে। দেশের আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত