গবেষণা নয়, ঐতিহ্যে গর্ব

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯২১ সালের ১ জুলাই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ১০৫ বছর পূর্ণ করে আজ ১০৬তম বছরে পদার্পণ করছে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান দেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই বিদ্যাপীঠের নাম। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ১০৬ বছরে এসে প্রশ্ন উঠছে, ঐতিহ্যের পাশাপাশি গবেষণায়ও কি সমানভাবে এগোতে পেরেছে দেশের সর্বোচ্চ এই বিশ্ববিদ্যালয়?

প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল অবিভক্ত বাংলার শিক্ষাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি এবং পূর্ববঙ্গের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা। সেই লক্ষ্য পূরণে দীর্ঘ সময় ধরে নেতৃত্ব দিয়ে এলেও বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার বর্তমান বাস্তবতায় গবেষণা ও উদ্ভাবনের যে গুরুত্ব, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান এখনো প্রত্যাশার তুলনায় অনেক পিছিয়ে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও রাজনৈতিক দলীয়করণ, আবাসন সংকট, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান হয়নি। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর ও গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের যে প্রত্যাশা ছিল, তারও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায় গবেষণা খাতের বরাদ্দেও। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ হাজার ৩৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকার বাজেটের মধ্যে গবেষণার জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ২১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র ২ দশমিক ০৮ শতাংশ। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১ হাজার ৩৩ কোটি ২১ লাখ ৮৩ হাজার টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়।  এর মধ্যে ইউজিসি ৯৪৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দিলেও গবেষণা খাতে কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখেনি। শিক্ষার্থীদের মতে, দেশের উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে হলে গবেষণায় বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর বিকল্প নেই।

এদিকে গবেষণা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে ব্যবধান বিশাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় বছরে প্রায় ১২ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ১২ হাজার ৮০০ কোটি, মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় ১৩ হাজার ৮২৫ কোটি, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর ৮ হাজার ৭৮০ কোটি, টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় ৭ হাজার ৫৫০ কোটি এবং ভারতের আইআইটি মাদ্রাজ প্রায় ১ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা গবেষণায় ব্যয় করে। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বরাদ্দ কয়েক কোটি টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

তবে সীমিত অর্থায়নের মধ্যেও গবেষণা প্রকাশনায় দেশের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০২৫ সালে স্কোপাস ইনডেক্সড জার্নালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকরা ১ হাজার ৭৮৯টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন, যা দেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা ছিল ৮০৪টি এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৭৮টি।

আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়েও দেশের সেরা অবস্থান ধরে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৬ সালের কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিংয়ে বিশ্বের শীর্ষ ৬০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান করে নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অবস্থান বজায় রাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। একই সঙ্গে কিউএস এশিয়া ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিংয়ে এশিয়ার ১৩২তম স্থানে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন,দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অধ্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নেও বিশ্ববিদ্যালয়টি ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে ৩০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অ্যালামনাই এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে গবেষণা খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও শক্তিশালী গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে।

দিনব্যাপী কর্মসূচি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী  উপলক্ষে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ বুধবার দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হল ও হোস্টেল থেকে শোভাযাত্রাসহ সবাই স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে সমবেত হবেন। সেখান থেকে পৌনে ১০টায় উপাচার্যের নেতৃত্বে শোভাযাত্রা বের হবে। সকাল সাড়ে ১০টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।