শিকারে বিপন্ন বুনোমহিষ

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ০৫:১০ এএম

বঙ্গোপসাগরের তীরঘেঁষা পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর সোনারচর অভয়ারণ্যে বুনোমহিষ শিকার থামছেই না। বন বিভাগের একের পর এক মামলা, অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও বেপরোয়া চোর সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, চক্রটি ফাঁদ পেতে বুনোমহিষ ধরে। পরে সেগুলো জবাই দিয়ে মাংস বিক্রি করে। আবার অনেক মহিষ জীবিত অবস্থায় অন্যত্র পাচার করে। এভাবে গত এক বছরে বুনোমহিষের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এ কারণে সোনারচরের বুনোমহিষ বিলুপ্তির শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। এদিকে মহিষ চুরি ও শিকারসংক্রান্ত মামলায় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কয়েকজন নেতার নাম আসায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।

রাঙ্গাবালী উপজেলার উপকূলে জেগে ওঠা সোনারচর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। বন অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, বিস্তীর্ণ বনভূমি, খাল-নালা আর  প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত ঘেরা এ বনকে সরকার ২০১১ সালের ২৪ ডিসেম্বর বন্যপ্রাণী ও পাখপাখালির অভয়ারণ্য ঘোষণা করে। ২ হাজার ২৬ দশমিক ৪৮ হেক্টর আয়তন নিয়ে এ অভয়ারণ্যটি গঠিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর জীববৈচিত্র্যের জন্য সম্ভাবনাময় সোনারচর এখন বন্যপ্রাণী শিকারিদের থাবায় বিপন্ন হতে পারে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সোনারচরে বর্তমানে ২০০ থেকে ২৫০ বুনোমহিষ রয়েছে। অথচ বন বিভাগের করা গত বছরের একটি মামলার এজাহারের তথ্য বলছে, সোনারচরে বুনোমহিষের সংখ্যা ৪০০ থেকে ৫০০। একের পর এক শিকার ও পাচারের ফলে মাত্র এক বছরে বুনোমহিষের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এ কারণে সোনারচরের বুনোমহিষ বিলুপ্তির শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র ও বন বিভাগের মামলার নথি ঘেঁটে জানা গেছে, সংঘবদ্ধ এই চোরচক্র দীর্ঘদিন ধরে সোনারচরের গভীর বনে ফাঁদ, রশি ও অন্যান্য কৌশল ব্যবহার করে মহিষ ধরে। পরে সেই মহিষ নির্জন এলাকায় নিয়ে জবাই করে মাংস বিক্রি করা হয়। অনেক সময় জীবিত মহিষ অন্যত্র পাচারও করা হয়। চরটির দুর্গম অবস্থান, বনাঞ্চলের ভেতরে বন বিভাগের দুর্বল নজরদারি এবং নদীপথের সুবিধা কাজে লাগিয়ে চক্রটি বছরের পর বছর এ অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

আসামিদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা : অভিযোগ রয়েছে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও চোরচক্রের দৌরাত্ম্য থেমে নেই। পার্থক্য শুধু আগে মামলা হতো না, এখন মামলা হয়। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, আগে এই চোরচক্র নিয়ন্ত্রণ করত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় কিছু নেতা। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই চোরচক্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন স্থানীয় বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতা।

বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩ মার্চ সংরক্ষিত বন থেকে একটি বুনোমহিষ ধরে জবাই ও মাংস বিক্রির অভিযোগে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ওই মামলায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে চলতি বছরের ২২ মার্চ আবারও সোনারচর বিট এলাকায় ফাঁদ পেতে মহিষ শিকার ও মাংস পাচারের অভিযোগে আরেকটি মামলা করে বন বিভাগ, মামলায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়। সর্বশেষ গত ৪ জুন আবার মহিষের মাংসসহ একজনকে আটক করে বন বিভাগ ও পুলিশ। এ ঘটনাতেও তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। বন বিভাগের এই তিন মামলায় মোট ১৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আসামিও রয়েছে। আসামিদের মধ্যে রয়েছেন চরমোন্তাজ ইউনিয়নের চরআন্ডা ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ইদ্রিস, ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের বহিষ্কৃত সভাপতি কামাল শিকদার, একই ওয়ার্ডের স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসভাপতি মো. আমজাদ মল্লিক এবং উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত সদস্য মো. কাইয়ুম শিকদার। এদের মধ্যে কামাল শিকদার ও কাইয়ুম শিকদারকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

চরমোন্তাজ রেঞ্জ কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কেউ কেউ এসব অপকর্ম করছে। তবে মামলাগুলোর দ্রুত রায় এবং সাজা দেওয়া হলে এ ধরনের অপরাধ নির্মূল হবে। বন বিভাগের সোনারচর ক্যাম্পের বিট কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মহিষ শিকারের উৎপাত বেড়েছে। গত কয়েক মাসে তিনটি মামলা হয়েছে। মহিষ শিকার বন্ধে আমরা টহল জোরদার করেছি।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, মহিষ চোর সিন্ডিকেটের সদস্যরা গ্রেপ্তার হলেও অনেক সময় আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায়। কেউ কেউ জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও জড়িয়ে পড়েন। তাদের মতে, শুধু মাঠপর্যায়ের শিকারিদের ধরলেই হবে না; তাদের পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। চরমোন্তাজ ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক আবু ইউসুফ মো. সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘সোনারচর অভয়ারণ্যে বুনোমহিষ চুরি ও শিকারের কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এই চক্রটির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে তিনটি মামলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।’

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বনায়ন ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. শাহরিয়ার জামান বলেন, ‘বুনোমহিষ শুধু বাংলাদেশের নয়, এশিয়ার অন্যতম হুমকিগ্রস্ত বৃহৎ তৃণভোজী প্রাণী। এদের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় শিকার ও পাচারের কারণে প্রজাতিটির ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।’ তিনি আরও বলেন, সোনারচরে যদি প্রকৃতপক্ষে মাত্র ২০০-২৫০টি বুনোমহিষ অবশিষ্ট থাকে, তাহলে শিকার ও পাচারের কারণে তাদের দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা কঠিন হবে এবং এ ধারা অব্যাহত থাকলে একসময় সোনারচরের বুনোমহিষ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। বুনোমহিষ উপকূলীয় তৃণভূমি ও জলাভূমির উদ্ভিদ কাঠামো নিয়ন্ত্রণ, বীজ বিস্তার এবং পুষ্টিচক্র বজায় রাখতে ভূমিকা পালন করে। ফলে এদের সংখ্যা কমে গেলে পুরো বাস্তুতন্ত্রের কার্যকারিতা ও জীববৈচিত্র্য নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত