সন্দ্বীপে সেতু নির্মাণ স্বপ্ন নয় প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে যখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, তখন আবারও আলোচনায় বঙ্গোপসাগরের বুকে অবস্থিত দ্বীপ সন্দ্বীপ। একসময়ের কৃষি, নৌবাণিজ্য ও জনবসতির জন্য পরিচিত এই দ্বীপ আজও যোগাযোগ সংকট, ভূমি জটিলতা এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগের অভাবে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে। তবে সম্ভাবনার দিক থেকে সন্দ্বীপকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ হিসেবে মনে করেন নবনির্বাচিত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)-এর চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি সন্দ্বীপের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা, সেতু নির্মাণ, পর্যটনশিল্প, কোস্টাল ফেরি, মাদকমুক্ত সমাজ গঠন এবং ভূমি উদ্ধার নিয়ে কথা বলেন।

বেলায়েত হোসেন বলেন, সন্দ্বীপের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই বাস্তবতা ও সম্ভাবনা দুটোই বিবেচনায় নিতে হবে। সিডিএ মহানগর পেরিয়ে উপজেলাগুলোতে উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেবে। সন্দ্বীপ দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দ্বীপগুলোর একটি। কিন্তু উন্নয়নের জন্য শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না। প্রয়োজন ঐক্য, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা। অতীতে অনেক প্রকল্প কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে সন্দ্বীপবাসী উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের দ্বীপগুলোতে পর্যটনশিল্প বিকাশের জন্য আন্তরিক এবং উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

সন্দ্বীপবাসীর অন্যতম দাবি, সেতু নির্মাণের মাধ্যমে মূল ভূখ-ের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রকল্প। তাই অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিশ্চিত না করে শুধু আবেগ দিয়ে এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা কঠিন। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করে যৌথ উদ্যোগে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমে সন্দ্বীপের অর্থনৈতিক কর্মকা- বাড়াতে হবে। পর্যটন, শিল্প, কৃষি এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণ ঘটলে সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা ও অর্থনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও শক্তিশালী হবে।

সিডিএ চেয়ারম্যানের মতে, সন্দ্বীপের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনের কথা উঠলে সবাই কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটার কথা বলেন। কিন্তু সন্দ্বীপেও রয়েছে এর অপার সম্ভাবনা।’

তিনি বলেন, সন্দ্বীপের চতুর্পাশে নির্মিত বেড়িবাঁধে মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ করা গেলে উপকূলীয় সুরক্ষা যেমন জোরদার হবে, তেমনি পর্যটনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, স্থানীয় অর্থনীতি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাও লাভবান হবে।

সন্দ্বীপের চরাঞ্চল ও ভূমি নিয়ে দীর্ঘদিনের নানা জটিলতার প্রসঙ্গ তুলে বেলায়েত হোসেন বলেন, অতীতে বিভিন্ন সময়ে দ্বীপের চরাঞ্চল এবং ভূমি নিয়ে নানা অনিয়ম ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জোর করে সন্দ্বীপের সব চর দখল করে নিয়েছিল। এই জায়গা উদ্ধার করতে হবে। ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কার্যক্রমও গতি পাবে। তিনি বলেন, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ, উড়িরচরের ভাঙন বন্ধে ক্রসড্যাম পরিকল্পনাসহ সন্দ্বীপের উত্তর পশ্চিমে উন্নয়নকে কেন্দ্র করে কয়েকশ কোটি টাকার যে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে তা বাস্তবায়িত হলে ভূমি রক্ষা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কর্মকা- সম্প্রসারণে ওই এলাকা বড় ভূমিকা রাখবে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কোস্টাল ফেরি চালু এবং নতুন তিনটি পন্টুন নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অতীতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে সন্দ্বীপ- সীতাকু- রুটে জনপ্রিয় ফেরি সার্ভিস কাক্সিক্ষত সফলতা পায়নি। এসব সীমাবদ্ধতা অবসান ঘটিয়ে নিরাপদ নৌ-যাতায়াত প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সন্দ্বীপবাসীর প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘আমাদের আবার কৃষিতে ফিরতে হবে। দ্বীপটি ক্রমেই প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আধুনিক কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুলতে পারলে স্থানীয় অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।’

সন্দ্বীপকে মাদকমুক্ত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, ‘মাদক যুবসমাজকে ধ্বংস করছে। এ বিষয়ে কোনো আপস হবে না। চট্টগ্রাম পুলিশ সুপারের সঙ্গে এ বিষয়ে ইতিমধ্যে আলোচনা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

সবশেষে বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘সন্দ্বীপের উন্নয়ন কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একার পক্ষে সম্ভব নয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ভুলে সবাইকে উন্নয়নের প্রশ্নে এক হতে হবে। জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, ব্যবসায়ী, প্রবাসী, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণ একসঙ্গে কাজ করলে সন্দ্বীপের ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব। সন্দ্বীপের উন্নয়ন কোনো স্বপ্ন নয়; প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা এবং ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ।’