পেরিয়ে গেল এক দশক

যে হামলা কাঁপিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এবং কলঙ্কিত সন্ত্রাসী হামলার এক দশক পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাজধানীর গুলশানের অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত হলি আর্টিজান বেকারিতে ঘটে যাওয়া সেই নৃশংস ঘটনা আজও দেশবাসীকে শিহরিত করে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে বড় ধরণের আঘাত করা সেই হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন দেশি-বিদেশি ২২ জন নিরীহ মানুষ। আজ ১০ বছর পরেও সেই রাতের দুঃস্মৃতি এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে জনমনে আলোচনা থামেনি।

ঘটনার দিন সন্ধ্যায় ইফতার পরবর্তী সময়ে আকস্মিক অস্ত্রধারী জঙ্গিদের হামলায় পুরো এলাকা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। রাতভর চলা এই জিম্মি সংকট নিরসনে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দুই পুলিশ কর্মকর্তা—গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল করিম এবং বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন খান শাহাদাতবরণ করেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় পরদিন ২ জুলাই সকালে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত হয় সফল ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’। কিন্তু ততক্ষণে রেস্তোরাঁর ভেতর থেকে ২০ জন জিম্মির নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়, যাদের মধ্যে ছিলেন ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশি।

আইনি লড়াইয়ের চিত্রটি বেশ দীর্ঘ। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল নব্য জেএমবির সাত সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান দেন। এরপর মামলার নথিপত্র ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে পৌঁছায় এবং আসামিরা আপিল করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর হাইকোর্ট সাত আসামির সাজা কমিয়ে তাদের আমৃত্যু কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন।

তবে এখানেই মামলার সমাপ্তি ঘটেনি। হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডিত আসামিদের মধ্যে ছয়জন আপিল বিভাগে পৃথকভাবে লিভ টু আপিল করেছেন, যা এখন শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। বর্তমান আইনি অবস্থা সম্পর্কে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাসুদ রানা জানান, রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি শুনানির জন্য নিয়মিত কার্যতালিকায় আনার বিষয়ে তৎপর রয়েছে।

উল্লেখ্য, এই দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার মাঝে বড় ধরণের পরিবর্তন এসেছে দণ্ডিত আসামিদের তালিকায়। আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের একজন আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ গত বছরের ৬ জুন গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে কারারক্ষীদের গুলিতে নিহত হন। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে কারাগার থেকে বন্দি পালানোর সময় এই ঘটনা ঘটে।

তদন্ত সংস্থা এবং আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নব্য জেএমবি নামধারী উগ্রবাদী গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ পরিকল্পনায় এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। সরাসরি হামলায় অংশগ্রহণকারী পাঁচ হামলাকারী অপারেশন থান্ডারবোল্ট চলাকালীন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছিল। আজ এক দশক পরে দাঁড়িয়েও স্বজন হারানো পরিবারগুলো এবং সাধারণ মানুষ সেই রাতের ভয়ংকর অভিজ্ঞতাকে ভুলতে পারেনি। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমানে আপিল বিভাগের দিকেই তাকিয়ে আছে পুরো দেশ।