দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ বুধবার (১ জুলাই) থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে নবম পে-স্কেল। এখনও গেজেট প্রকাশ না হলেও নতুন এই কাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধিতে আমূল পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে সর্বোচ্চ ১৩৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল বেতন বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ১ থেকে ১০ম গ্রেডের উচ্চতর কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হতে পারে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্তকে সরকারি চাকরিতে স্থিতিশীলতা আনার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে বেতন কাঠামো কার্যকর হলেও বর্ধিত এই অর্থের সুফল পেতে সরকারি চাকরিজীবীদের কিছুটা ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ জুলাই থেকে পে-স্কেল কার্যকর হলেও এর প্রজ্ঞাপন জারি, ভাতা পুনর্বিন্যাস এবং বেতন ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারে প্রয়োজনীয় কারিগরি আপডেট সম্পন্ন হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে এই প্রক্রিয়াকে সহজ ও ত্রুটিমুক্ত করার জন্য কাজ চলছে। সব প্রস্তুতি শেষে পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যেই বর্ধিত বেতন ব্যাংকিং চ্যানেলে সমন্বয় করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন এই পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার দুটি ভিন্ন মডেল নিয়ে পর্যালোচনা করছে। প্রথমত, দুই ধাপে বাস্তবায়ন যেখানে প্রথম বছর পুরো মূল বেতন কার্যকর করা হবে এবং দ্বিতীয় বছরে বিভিন্ন ভাতার সমন্বয় করা হবে। দ্বিতীয়ত, তিন ধাপের পরিকল্পনা যেখানে তিন বছরে পর্যায়ক্রমে মূল বেতন ও ভাতার সমন্বয় সম্পন্ন হবে। অর্থ বিভাগের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বাজেট ও হিসাব ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারে (আইবিএএস) জটিলতা এড়াতে পুরো মূল বেতন একবারেই কার্যকর করা বেশি কার্যকর হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন সচিব কমিটি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন বেতন কাঠামোর জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছেন। এই বরাদ্দ সরকারি চাকুরেদের জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে এলেও অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে কিছু যৌক্তিক পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, বেতন বৃদ্ধি শুধু জীবনযাত্রার মানই বাড়াবে না, বরং পেশাগত উৎকর্ষ সাধনেও সহায়ক হবে। তবে দুর্নীতি রোধে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা ও তাদের নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব তথা সম্পদবিবরণী প্রতিবছর প্রকাশ করার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন।
বিভিন্ন মহলের মতে, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের এই উদ্যোগটি সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তবে একই সাথে দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম ও লুটপাটের সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বারবার উঠে আসছে।
অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহর মতে, সীমিত আয়ের সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এই বেতন বৃদ্ধি সময়োপযোগী। তবে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং মুদ্রাস্ফীতির প্রভাবকে ভারসাম্যপূর্ণ রেখে এই কাঠামোর সুষ্ঠু বাস্তবায়নই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এবং দুর্নীতিমুক্ত সেবা প্রদানের অঙ্গীকারের মাধ্যমেই এই নবম পে-স্কেল প্রকৃত অর্থে জনগণের উপকারে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।